পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায়: মহানির্বান তন্ত্রে বলা হয়েছে – “উগ্রতারা শূলপাণি সুভদ্রা ভুবনেশ্বরী/ নীলাদ্রৌ তু সাক্ষাৎ জগন্নাথ দক্ষিনাকালিকা।।”
অর্থাৎ, শূলপাণি বলভদ্র সাক্ষাৎ দেবী উগ্রতারা, সুভদ্রা হলেন দেবী ভুবনেশ্বরী এবং নীলাদ্রিক্ষেত্রে অবস্থিত মহাপ্রভু জগন্নাথ স্বয়ং পরব্রহ্মস্বরূপ নির্গুণ শূণ্যরূপা দক্ষিণাকালী। তিনি শাক্তদের কাছে দক্ষিণাকালী, ব্রহ্মবাদীদের কাছে দারুব্রহ্ম, বৈষ্ণবদের কাছে গোলকবিহারী, তন্ত্রসাধকের কাছে ভৈরব—বিভিন্ন সময়ে নানান নামে নানান উপাচারে পূজিত হয়ে আসছেন তিনি। এভাবেই একইরূপে একইসঙ্গে নানান ধর্মের মানুষের নাথ হয়ে উঠেছেন জগন্নাথ, তিনিই সমগ্র মহাবিশ্বের অধিপতি, তিনি আদি, তিনি অনন্ত।
এবারে একত্রীভূত করে দেখলে দেখা যাবে, মহাপ্রভু জগন্নাথ কোনো নিৰ্দিষ্ট গোত্রের দেবতা নন। তিনি একাধারে বৈষ্ণব, শাক্ত এবং শৈব দেবতাদের সংমিশ্রিত রূপ। তেমনিই এক নিদর্শন দেখা যায় বীরভূমের মহাপীঠ তারাপীঠে, যেখানে মহাপ্রভু জগন্নাথ, বলভদ্র ও মা সুভদ্রার জায়গায় রথে করে মন্দির পরিভ্রমণ করানো হয় মা তারা’কে। তারাপীঠের সেই রথে অধিষ্ঠাত্রী মা তারা, তিনিই সেখানে জগন্নাথ।
তারাপীঠের রথযাত্রা ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল তা অনুমান করা কঠিন। তবে মন্দিরের সেবাইত সাহিত্যিক প্রবোধ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা বই থেকে জানা যায়, তারাপীঠের বিখ্যাত সাধক দ্বিতীয় আনন্দনাথ তারাপীঠে রথের প্রচলন করেছিলেন। সেই সময় একটি পিতলের রথ তৈরি করা হয়েছিল। সেই রথেই আজও মা তারাকে বসিয়ে ঘোরানো হয়। সে সময় তারা মায়ের একটি রথ ঘরও তৈরি করা হয়। জানা যায়, সারা বছর ওই রথ ঘরেই পিতলের রথকে সংরক্ষিত রাখা হয়। রথ ঘরটি নির্মাণ করেছিলেন জনৈক মা তারার ভক্ত আশালতা সাধু খাঁ।
তারা মায়ের এই রথ থেকে ভক্তদের উদ্দেশ্যে প্যাঁড়া, বাতাসা, মণ্ডা বিতরণ করা হয়। প্রতিবারই সেই প্রসাদ পেতে ভক্তদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। কথিত আছে, এই প্রসাদ গ্রহণ করলে আর পুনর্জন্ম হয় না, মানুষের মোক্ষ লাভ ঘটে।