পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায়: “ওঁ শঙ্খ চক্র ধরং বিষ্ণু দ্বিভূজং পীত বাসসম্।”
লীলা পুরুষোত্তম জগন্নাথের মূর্তি কেন অর্ধ সমাপ্ত ? জগতের অধিকর্তার কেনই বা এমন মূর্তি ?
আসলে এসবই কল্পনার অতীত, জগন্নাথ স্বয়ং অপূর্ণতার মধ্যে পূর্ণত্বের প্রকাশ। এই বিষয়ে বলতে গেলে বলতে হয় “পরক্ষপ্রিয়া দেবা” অর্থাৎ, দেবতারা পরোক্ষ প্রিয়, তিনি হয়তো পূর্ণ মনুষ্যদেহ চাননি। তাই তাঁর এমন রূপ।
জগন্নাথ অর্থাৎ “জগত বা ব্রহ্মাণ্ডের প্রভু”, তাঁর চোখ বৃহৎ ও গোলাকার, হাত অসম্পূর্ন; পা দেখা যায় না। বিষ্ণুর রূপভেদ হিসেবে তিনি অসাম্প্রদায়িক। তাকে এককভাবে হিন্দুধর্মের কোনো একটি সম্প্রদায়ের সঙ্গে কখনই যুক্ত করা যায় না। তাঁর মধ্যেই বর্তমান সমস্ত ধর্ম, দর্শন ও মত। বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, স্মার্ত সকল অনুগামীরাই পূজা করেন মহাপ্রভু জগন্নাথকে। এমনকি মহানির্বান তন্ত্রে বলা হয়েছে “নীলাদ্রৌ তু সাক্ষাৎ জগন্নাথ দক্ষিনাকালিকা” অর্থাৎ নীলাদ্রিক্ষেত্রে অবস্থিত মহাপ্রভু জগন্নাথ স্বয়ং পরব্রহ্মস্বরূপ নির্গুণ শূণ্যরূপা দক্ষিণাকালী। ভাগবত পুরাণে ঋষি মার্কণ্ডেয় পুরুষোত্তম জগন্নাথ ও শিবের একত্ব প্রমাণ করেছিলেন। এমনকি, মহারাষ্ট্রের গণপতি ভট্ট হাতিবেশের সময় জগন্নাথকে গণেশ রূপে পূজা করেছিলেন। ওড়িয়া কবি সরলা দাসের মতে, বিষ্ণুর সকল অবতারই জগন্নাথ থেকেই উৎসারিত এবং তাঁদের লীলা অবসানের পর জগন্নাথেই বিলীন হয়ে যান। তিনি শূন্য পুরুষ, নিরাকার ও নিরঞ্জন।
“জগন্নাথ” শব্দটি বিশেষত সংস্কৃতায়িত আদিবাসী শব্দ। প্রাচীন গবেষকেরা জগন্নাথকে মূলত আদিবাসী দেবতা মনে করতেন। ওড়িশার আদিম আদিবাসী শবররা ছিল বৃক্ষ-উপাসক। তারা তাদের দেবতাকে বলত “জগনাত”। সম্ভবত, এই শব্দটি থেকেই “জগন্নাথ” শব্দটি এসেছে। তবে জগন্নাথের সেই কথা বলতে গেলে আসতে হয় মহাভারতের কথায়। মহাভারতে মৌষল পর্বের শেষে শ্রীকৃষ্ণ অন্তর্হিত হলে অর্জুন তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন করলেন। শ্রীকৃষ্ণের পার্থিব দেহ ভস্মীভূত হলেও তাঁর হৃদয় দগ্ধ হয়নি। এরপর দৈববাণী অনুসারে অর্জুন একটি বৃহৎ কাষ্ঠখন্ডে শঙ্খ- চক্র- গদা- পদ্ম এঁকে তাতে ভগবানের হৃদয় যুক্ত করে সমুদ্রে ভাসিয়ে দেন। পরে তা ভাসতে ভাসতে এসে পৌঁছায় পুরীতে।
এদিকে উৎকলক্ষেত্রস্থিত শবররা ছিল নীলমাধবের উপাসক। তারা জগন্নাথকেই নীলমাধব রূপে পুজো করতো। অন্যদিকে কৃষ্ণভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন নীলমাধবের স্বপ্ন পান। তিনি রাজাকে জগন্নাথ বলভদ্র ও সুভদ্রার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করার আদেশ দেন।
স্বয়ং মহাপ্রভু তাঁর ভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের সম্মুখে আবিভূর্ত হয়ে পুরীর সমুদ্রতটে ভেসে আসা একটি নিম কাষ্ঠখণ্ড দিয়ে তার মূর্তি নির্মাণের আদেশ দেন এবং বলেন, শবররা ছাড়া সেই কাষ্ঠখণ্ড তোলা সম্ভব নয়। এরপর মূর্তিনির্মাণের জন্য রাজা একজন উপযুক্ত কাষ্ঠশিল্পীর সন্ধান করতে থাকলে স্বয়ং বিশ্বকর্মা এক রহস্যময় বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ কাষ্ঠশিল্পী রূপে তার সম্মুখে আবির্ভুত হন এবং মূর্তি নির্মাণের জন্য কয়েকদিন চেয়ে নেন। সেই কাষ্ঠশিল্পী রাজাকে জানিয়ে দেন মূর্তি নির্মাণকালে কেউ যেন না আসেন । বন্ধ দরজার আড়ালে শুরু হয় মহাপ্রভু নির্মাণ। রাজা ও রানি গুন্ডিচা সহ সকলেই নির্মাণকাজের ব্যাপারে অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ৬-৭ দিন বাদে রাজা ও অত্যুৎসাহী রানি কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলে দেখেন মূর্তি তখনও অর্ধসমাপ্ত এবং কাষ্ঠশিল্পী অন্তর্ধিত। ত্রিমূর্তির হস্তপদ নির্মিত হয়নি বলে রাজা বিমর্ষ হয়ে পড়েন। কাজে বাধাদানের জন্য অনুতাপ করতে থাকেন। তখন রাজা দৈববাণী শোনেন যে, সেই অর্ধসমাপ্ত মূর্তিই পরমেশ্বর জগন্নাথের মূর্তি। তিনিই জগতের নাথ , লীলা পুরুষোত্তম জগন্নাথ।
জগন্নাথ স্বামী নয়নপথ গামী ভবতু মে।।