পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায়: ‘নীলাচল নিবাসায় নিত্যায় পরমাত্মনে, বলভদ্র সুভদ্রাভ্যাং জগন্নাথায় তে নমঃ’।
রথযাত্রায় অগণিত ভক্তপ্রাণ মানুষ ব্যাকুল হৃদয়ে জগতের অধিপতিকে দেখার অপেক্ষায় থাকে। দেশ- বিদেশ থেকে আসা লক্ষ লক্ষ ভক্তের মন জুড়িয়ে যায় ভগবানকে দেখে। তবে জগতের অধিপতি শ্রী জগন্নাথ উল্টোরথের পরে আরও তিন দিন রথেই থাকেন। কিন্তু, কেন? তার পেছনে কি কোনও কারণ আছে? না কি মা লক্ষ্মীর অভিমান?
কলি যুগের অধিকর্তা মহাপ্রভু শ্রী জগন্নাথের রথযাত্রা মূলত খুবই দীর্ঘমেয়াদি একটি উৎসব, যেটি সমগ্র বিশ্বের সর্ববৃহৎ উৎসবগুলির মধ্যে অন্যতম। এটা নিঃসন্দেহেই বলা যেতে পারে যে, মহাপ্রভু তাঁর ছোট বোনের আবদার রাখতে আর নিজেও তাঁর ১৫ দিনের অসুস্থতার পর দাদা বলরামকে নিয়ে মাসির বাড়ি ঘুরতে যান বলে মা লক্ষ্মীর অভিমানে গাল ভারী হয় আর তাই তিনি অভিমানের বশবর্তী হয়ে তাঁর জগদীশ্বর স্বামীকে মন্দিরে ঢুকতে দেন না। তবে এ ছাড়াও রথযাত্রায় মহাপ্রভুর থাকে বেশ অনেকগুলি উপাচার। পহুন্ডি বিজে দিয়ে শুরু হয়ে তারপর একে একে সোজারথ, উল্টোরথ হয়ে গেলে পরে তারপরেও মহাপ্রভুর তিন দিন ধরে চলে স্বর্ণবেশ, অধরপনা ও সর্বশেষ উপাচারটি হল নীলাদ্রি বিজে।
স্বর্ণবেশ বা সুনাবেশ
এই বেশকে রাজেরাজেশ্বর বেশও বলা হয়। মহাপ্রভু ,বলভদ্র ও মা সুভদ্রাকে স্বর্ণালংকার দিয়ে ভূষিত করা হয়। মহাপ্রভু ও বলভদ্রের মুকুট ছাড়াও তাঁদের সোনার শ্রীভুজ ও শ্রীপদ থাকে। এছাড়াও থাকে সোনার চক্র, রুপোর শঙ্খ , ইত্যাদি ইত্যাদি। জেনে রাখা প্রয়োজন যে, এই স্বর্ণবেশ হওয়ার আগেই মন্দিরের রত্নভাণ্ডার খোলা হয়। সেই রূপ দর্শন করতে আসেন অগণিত ভক্ত। জগত পালকের এমন সুদর্শন রূপ দর্শন করে ধন্য হন ভক্তরা।
অধরপনা
স্বর্ণবেশের পরের দিন হয় অধরপনা উৎসব। এই দিন মাটির বড়ো বড়ো জগের মতো দেখতে পাত্রে বিভিন্ন মিষ্টি, দুধ, ও দই দিয়ে ঘোল প্রস্তুত করা হয়। তারপর পুজো করে ভেঙে ফেলা হয় পাত্রটি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে এই খাবার দেবতা বা মানুষ কেউই গ্রহণ করেন না। সেই খাবার হল শুধুমাত্র অতৃপ্ত আত্মাদের জন্য। প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে জগন্নাথ দেবকে দর্শন করতে আসে অতৃপ্ত আত্মারা। তারা অধরপনার এই ঘোল খেয়ে ও মহাপ্রভুকে দর্শন করে মুক্তি লাভ করে ।
নীলাদ্রি বিজে
নীলাদ্রি বিজের দিন মন্দিরে জগন্নাথ বলরাম ও সুভদ্রার দারু মূর্তিকে শ্রীমন্দিরে প্রবেশ করানো হয়। বলরাম ও সুভদ্রা মন্দিরে প্রবেশ করে আসন গ্রহণ করলেও মহাপ্রভু ও লক্ষ্মী দেবীর মধ্যে নানা কান্ড কারখানা শুরু হয়। জগন্নাথ দেবের মূর্তি প্রবেশের সময় মন্দিরের মূল ফটক বন্ধ করে দেন লক্ষ্মী দেবী। এতদিন বাড়ি ছেড়ে থাকার জন্য তাঁর কাছে নানান জবাবদিহি করতে হয় মহাপ্রভুকে। শেষে লীলা পুরুষোত্তম শ্রী জগন্নাথ লক্ষ্মী দেবীর মান ভাঙ্গালে দরজা খুলে দেন তিনি। এই প্রথা ঘিরেও চলে নানা অনুষ্ঠান। এইভাবেই সুসম্পন্ন হয় রথযাত্রার সম্পূর্ণ অনুষ্ঠান।