পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : দেবী কৌমারী হলেন সপ্ত মাতৃকার অন্যতম দেবী। যিনি কুমারী বা কার্তিকী নামেও পরিচিত। তিনি হিন্দু ধর্মে এক শক্তিশালী মাতৃকা দেবী রূপে পূজিত। কথিত আছে, তিনি দেব সেনাপতি কার্তিকেয়ের অন্তর্নিহিত নারীশক্তি, অর্থাৎ তাঁর কর্মক্ষমতার মূল উৎস। কৌমারী দেবীকে সাধারণত ময়ূরবাহনা, চতুর্ভূজা বা ষড়ভূজা রূপে কল্পনা করা হয়। যিনি ত্রিশূল, ধনুক, তীর, গদা, কুঠার, পদ্ম, ঢাল প্রভৃতি অস্ত্র ধারণ করেন। তাঁর বর্ণ কখনও হরিদ্রাভ (সবুজাভ), কখনও চম্পকবর্ণা বলে উল্লেখিত।
মহামায়ার রূপ ও উৎস
মন্ত্রে বলা হয়েছে,
ওঁ একবক্রাম্ ত্রিণেত্রাম চ চতুর্ভূজাম্ সমণ্বিতা ।
জটামুকুটাম্ সংযুক্তাম্ হরিৎবর্ণাম্ সুশোভনাম্ ।।
দেবী কৌমারী মহামায়ার এক রূপ। স্কন্দপুরাণ ও কালিকাপুরাণ মতে, ইনি এক অত্যন্ত শক্তিশালী, রণকৌশলী, স্বনিয়ন্ত্রিতা ও ধনুর্বিদ্যায় পারদর্শিনী দেবী। তিনি কার্তিকের রণশক্তি, কায়িক বল এবং বীর্যশক্তির উৎস। চণ্ড ভৈরবের সংকল্প ও কৌমারীর শক্তির মিলনে দেবকুমার স্কন্দ যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
কোলাসুরনাশিনী ও মহাসুর দমনকারী রূপ
দেবী কৌমারীর প্রথম আবির্ভাব কোলাসুর নামক এক অসুরকে দমন করতে। ব্রহ্মার বরপ্রাপ্ত এই অসুরের অত্যাচারে দেবতারা সঙ্কটে পড়লে, মহামায়া নিজেই কৌমারী রূপে আবির্ভূতা হন এবং কোলাসুরকে যুদ্ধে পরাস্ত করেন। আবার শুম্ভ-নিশুম্ভের বিরুদ্ধেও তিনি অস্ত্র হাতে রণে অবতীর্ণ হন ও অসুরদলন করেন।
রামায়ণের সঙ্গে সংযোগ
বৃহদ্ধর্মপুরাণ অনুসারে, রাম ও রাবণের যুদ্ধের সময় দক্ষিণায়ন চলছিল, যা দেবতাদের রাত্রিকাল। এই সময় দেবী যোগনিদ্রায় থাকেন। ব্রহ্মা তখন মহামায়ার কুমারী রূপকে জাগ্রত করতে ধরায় আগমন করেন এবং বিল্ববৃক্ষতলে কুমারী রূপে নিদ্রিতা দেবীকে স্তবের মাধ্যমে জাগ্রত করেন। তিনি রামের বিজয়ের আশ্বাস দেন এবং পরে শ্রী রাম অকালবোধনে তাঁর আরাধনা করেন।
পূজা ও সামাজিক প্রেক্ষাপট
বর্তমানে কৌমারী বা কুমারী পূজা একপ্রকার লুপ্তপ্রায় হলেও, বেলুড় মঠে এখনও এই পূজা প্রচলিত। তন্ত্রশাস্ত্র অনুযায়ী, ষোড়শবর্ষীয়া অবিবাহিতা কন্যার মধ্যেই দেবী কৌমারীর রূপ ধরা পড়ে। এই পূজাকে ‘ষোড়শ কুমারী পূজা’ বলা হয় এবং এই ষোড়শ কুমারীরা ষোড়শ সিদ্ধিদাত্রী বলে বিবেচিত। দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ুর কন্যাকুমারী মন্দিরে দেবী কৌমারী নিত্য পূজিতা, যেখানে তিনি চিরকুমারী রূপে অধিষ্ঠিতা।
নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, দেবী কৌমারী একাধারে নারীত্ব, শৌর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রতীক। তাঁর অস্তিত্ব কেবল পৌরাণিক কাহিনিতে নয়, বরং সাংস্কৃতিক চেতনায় নারীশক্তির অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে তুলে ধরে। তিনি কর্মপ্রেরণা, রণশক্তি এবং আত্মরক্ষার এক আদর্শ মূর্তি।