নিজস্ব প্রতিনিধি: হিন্দু পুরাণের ব্যাপ্তি এমন, যার অধিকাংশ ঘটনাই আমাদের অজ্ঞাত রয়ে যায়। তেমনই একটি বিশেষ ঘটনা হল জগৎপালক শ্রী হরি ও গঙ্গার বিবাহ। আমরা অনেকেই এ বিষয়ে অবগত নই যে, দেবী গঙ্গা মূলত শ্রী বিষ্ণুরই পত্নী ছিলেন। হিন্দু পুরাণে গঙ্গা দেবী শুধু একটি নদী নয়, বরং তাঁর পৌরাণিক মাহাত্ম্য অপরিসীম। তাঁর আবির্ভাব, বৈকুণ্ঠ গমন, ও পরবর্তীকালে শ্রীবিষ্ণুর সঙ্গে বিবাহ—এই সমস্ত কাহিনি সনাতন ধর্মের আধ্যাত্মিক চিন্তাধারার গভীরতাকে তুলে ধরে। ‘গঙ্গা’ শব্দের অর্থই হল ‘স্বর্গ থেকে আগত’, এবং গঙ্গা আদতে এক অলৌকিক নারী শক্তির প্রতীক, যিনি সৃষ্টি, শুদ্ধতা ও মোক্ষের বাহক। পুরাণ মতে, গঙ্গা শুধুমাত্র একটি পবিত্র নদীই নয়, বরং তিনি শ্রীবিষ্ণুর পত্নী হিসেবে তাঁর এক অনন্য রূপ লাভ করেন।
পুরাণ অনুসারে, গঙ্গার উৎপত্তি হয়েছিল শ্রীবিষ্ণুর চরণকমল হতে। দেবী গঙ্গা শান্ত, অহঙ্কারহীন, নবযৌবনা এক শুদ্ধ সত্ত্বস্বরূপা, যিনি স্বয়ং শ্রীবিষ্ণুকেই তাঁর পতিরূপে বরণ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এই প্রস্তাবে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন লক্ষ্মীদেবী। তিনি গঙ্গার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে পান করতে উদ্যত হলে গঙ্গা সন্ত্রস্ত হয়ে আশ্রয় নেন শ্রীহরির পাদপদ্মে। ফলত গোলোকে সৃষ্টি হয় এক জলশূন্য দুর্দশা। এই পরিস্থিতিতে ব্রহ্মা ও নারদ বৈকুণ্ঠে গিয়ে শ্রীবিষ্ণুর চরণে প্রণাম জানিয়ে গঙ্গার প্রশংসা করেন। ব্রহ্মা বলেন, গঙ্গা শ্রেষ্ঠা, পরম রসিক, শান্ত সত্ত্বার প্রতীক। তিনি লক্ষ্মীদেবীর প্রসন্নতা ও শ্রীবিষ্ণুর কৃপা কামনা করেন, যেন গঙ্গার মান রক্ষা হয় এবং তিনি বিবাহের মাধ্যমে স্বীকৃত হন।
অতঃপর ব্রহ্মা নিজ হাতে গঙ্গাকে শ্রীবিষ্ণুর হাতে সমর্পণ করেন। শ্রীবিষ্ণু তাঁকে গান্ধর্ব মতে বিবাহ করে ভার্যারূপে গ্রহণ করেন। সেই শুভ লগ্নে দেবতারা, ঋষি-মুনি ও গন্ধর্বরা উপস্থিত থাকেন। ফুলে ও চন্দনে সজ্জিত শয্যায় তাঁরা মিলিত হন রতিসুখে। গঙ্গা তখন রতিক্রিয়ায় এমন পরম তৃপ্তিতে মোহিত হন যে, তিনি আনন্দে মূর্ছা যান। এই বিবাহ শুধু শারীরিক মিলনের রূপক নয়, বরং সত্ত্ব ও চৈতন্যের ঐক্য, পুরুষ ও প্রকৃতির মধুর মিলন।
তবে, এই বিবাহে লক্ষ্মীদেবী ঈর্ষান্বিতা না হলেও, শ্রী হরির দ্বিতীয় স্ত্রী দেবী সরস্বতী গঙ্গাকে শ্রীবিষ্ণুর নব পত্নী হিসেবে মেনে নিতে পারেননি। পরবর্তীতে শ্রীনারায়ণ তুলসীকেও বিবাহ করেন, যার ফলে শ্রী বিষ্ণুর চারজন পত্নী হন—লক্ষ্মী, সরস্বতী, গঙ্গা ও তুলসী। এই চার দেবী নারায়ণের ভিন্ন ভিন্ন শক্তির প্রকাশ। লক্ষ্মী সম্পদ ও ঐশ্বর্যের, সরস্বতী জ্ঞান ও সঙ্গীতের, গঙ্গা পবিত্রতার, আর তুলসী ভক্তি ও আত্মত্যাগের প্রতীক।
গঙ্গার শ্রীবিষ্ণুর সঙ্গে বিবাহের এই কাহিনি শুধুমাত্র পৌরাণিক অলঙ্কার নয়, বরং এটি নারীর মহিমা, পুরুষতত্ত্বের গ্রহণশীলতা ও সৃষ্টির নৈতিক সমতা রক্ষার এক গাঢ় বার্তা বহন করে। গঙ্গা যেমন পবিত্রতার প্রতীক, তেমনি শ্রীবিষ্ণুর সঙ্গে তাঁর বিবাহও দ্যুতিপূর্ণ ঐশ্বরিক মিলনের প্রতিচ্ছবি। এই কাহিনির মাধ্যমে ভক্তরা উপলব্ধি করেন নারীর স্বরূপ, শক্তি ও শ্রেষ্ঠত্ব, যা পরমাত্মার সঙ্গেই যুক্ত হয়ে শাশ্বত সৃষ্টির ধারাকে এগিয়ে নিয়ে চলে।