পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : নানা ঐতিহ্যে ভরা পূণ্যতীর্থ ভারত। এই দেশের অধিকাংশ জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন তীর্থস্থান। এই সমস্ত তীর্থক্ষেত্রের মধ্যে অন্যতম হল বিহার রাজ্যের গয়া। যা একটি প্রাচীন, ঐতিহাসিক এবং আধ্যাত্মিক তীর্থস্থান হিসেবে বিশেষভাবে চিহ্নিত। হিন্দু ধর্মের অন্যতম পবিত্র এই ভূমি হাজার হাজার বছর ধরে পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তির জন্য শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান করার স্থান হিসেবে পরিচিত। ‘গয়াতীর্থ’ শুধু একটি ধর্মীয় স্থান নয়, এটি এক মহাপুণ্যক্ষেত্র, যেখানে শ্রদ্ধা, বিশ্বাস এবং পারলৌকিক রীতি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৈরি করেছে এক অনন্য ধারার। এক্ষেত্রে মানুষের কৌতূহলী মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, কী ভাবে এই গয়া তীর্থের উৎপত্তি হয়েছিল?
গয় এবং গয়ার উৎপত্তিকথা
গয়াতীর্থের মাহাত্ম্য মূলত শুরু হয় গয় নামে এক অসুরের কাহিনি থেকে। কথিত আছে, একদা গয়াসুর নামে এক মহাশক্তিশালী এবং শিবভক্ত অসুর ছিলেন, যিনি একবার এমন কঠোর তপস্যা করেছিলেন যে তার প্রভাবে স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল—তিনটি লোকই কাঁপতে শুরু করে। দেবতারা এই তপস্যার প্রভাবে শঙ্কিত হয়ে শ্রীবিষ্ণুর শরণাপন্ন হন।
শ্রীবিষ্ণু প্রথমে জানান, গয়াসুর তপস্যার ফলে শিবধামে গমন করবে, এবং সৃষ্টির কোনও ক্ষতি হবে না। কিন্তু দেবতারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, অসুর স্বরূপে থেকে যদি শক্তি অর্জন করে, তবে সৃষ্টির ভারসাম্য নষ্ট হবে। তখন শ্রীবিষ্ণু তাঁদের আশ্বস্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
একদিন গয়াসুর ক্ষীরোদ সাগর থেকে ফুল এনে শিবের পূজা করতে যাচ্ছিলেন। সেই সময় শ্রীবিষ্ণু তাঁর উপর মায়া বিস্তার করেন। গয়াসুর অচৈতন্য হয়ে পড়েন এবং বিষ্ণু সেই সুযোগে তাঁর মাথায় গদা প্রহার করে তাঁকে নিধন করেন। গয়াসুরের দেহ যেই স্থানে পড়েছিল, সেই স্থানেই জন্ম নেয় গয়াতীর্থ।
গয়াতীর্থের পুণ্যফল
গয়াতীর্থ এমন এক স্থান, যেখানে স্নান, শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদান করলে মানুষ ব্রহ্মলোকে গমন করে এবং নরক যন্ত্রণার শিকার হয় না। এই তীর্থক্ষেত্রে ব্রহ্মা স্বয়ং যজ্ঞের আয়োজন করেন এবং বহু ব্রাহ্মণকে পৌরোহিত্য করতে আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু ব্রাহ্মণরা যখন লোভী হয়ে সমস্ত যজ্ঞোপকরণ নিয়ে তীরেই বাস করতে শুরু করেন, তখন ব্রহ্মা রুষ্ট হয়ে তাদের উপর অভিশাপ দেন—তাঁদের তিন পুরুষের জ্ঞান ও ধন ধ্বংস হবে, কেবল এই পাষাণ ও নদীই তাঁদের আশ্রয় হবে।
পরে ব্রাহ্মণদের স্তব শুনে ব্রহ্মা প্রসন্ন হন এবং বলেন, ভবিষ্যতে পুণ্যার্থীরা এখানে শ্রাদ্ধ করতে এলে তারা ব্রাহ্মণদের পূজা করবে, আর সেইসঙ্গে তিনিও পূজিত হবেন। এই তীর্থে স্নান করলে সকল তীর্থের স্নানের সমান পুণ্য লাভ হয়, এমনকী ব্রহ্মহত্যা, চুরি, সুরাপান প্রভৃতি মহাপাপ থেকেও মুক্তি মেলে।
গয়াতীর্থের ধর্মীয় তাৎপর্য
গয়াতীর্থ শুধু পূর্বপুরুষদের শ্রাদ্ধস্থল নয়, এটি এক ধর্মীয় অনুভূতির কেন্দ্র। এমনকি যে ব্যক্তি গয়ায় পিণ্ডদান বা শ্রাদ্ধ করার জন্য অন্য কাউকে উৎসাহিত করে, তিনিও পুণ্যলাভ করেন। এখানে গমন পিতৃঋণ থেকে মুক্তির একটি সুযোগ। তাই নিঃসন্দেহেই গয়াতীর্থ ভারতীয় হিন্দুদের কাছে আজও অত্যন্ত পবিত্র স্থান হিসেবে পরিগণিত, যেখানে শ্রদ্ধা, ভক্তি ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে আধ্যাত্মিক মুক্তির দ্বার উন্মুক্ত হয়।