পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : মহাভারত নামেই বোঝা যায় এই পৌরাণিক মহাকাব্যের সুবিশাল ব্যাপ্তি। ভারতে যা যা আছে, ঠিক সেগুলিরই বর্ণনা রয়েছে এই মহাকাব্যে। তাই কথায় বলে, যা নেই ভারতে, তা নেই মহাভারতে। নীতিশাস্ত্র থেকে শুরু করে ইতিহাস,দর্শন,রাজনীতি, যুদ্ধকৌশল এমন কিছু নেই যা নিয়ে মহাভারতে আলোকপাত করা হয়নি। এই মহাকাব্যে প্রতিটি চরিত্রই যেন এক একটি ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। এই মহাকাব্য মূলত ধর্ম ও অধর্মের দ্বন্দ্বের বিষয়ে রচিত হয়েছিল। সেই ধর্মযুদ্ধের পাতায় বহু বীরপুরুষের বর্ণনা থাকলেও কিছু চরিত্র নিজেদের সততা ও ন্যায়পরায়ণতার কারণে নীরবতর হলেও পৌরাণিক ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছেন। এমনই একজন হলেন — যুযুৎসু, ধৃতরাষ্ট্রের একমাত্র কানীন পুত্র, যিনি কৌরব বংশোদ্ভূত হয়েও কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষে জীবিত ছিলেন।
জানা যায়, ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর সন্তানলাভ ছিল বহু প্রতীক্ষিত। ধৃতরাষ্ট্রের ঔরসে গান্ধারীর গর্ভ থেকে শতপুত্র জন্মালেও, ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারীর বৈশ্য দাসী সুগধার থেকেও পুত্রলাভ করেন — সেই সন্তানই ছিলেন যুযুৎসু। যদিও তিনি ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র ছিলেন, তাঁর জন্ম বৈধ বিবাহসূত্রে না হওয়ায় তিনি কখনও কৌরবদের প্রধান বৃত্তে স্থান পাননি। কিন্তু দুর্যোধন ও তার ভাইদের মধ্যে যে দুরভিসন্ধির বিষ ছিল, তা যুযুৎসুর চরিত্রে ছিল না। বরং তিনি ছিলেন ধর্মবোধসম্পন্ন, বিবেকবান এক মহাবীর।
ছেলেবেলা থেকেই যুযুৎসু দুর্যোধনের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন। বিশেষ করে ভীমকে বিষপান করিয়ে হত্যা করার জন্য দুর্যোধনের যে ষড়যন্ত্র, তা সম্পর্কে তিনি আগেভাগেই পাণ্ডবদের অবগত করে দিয়েছিলেন। এর থেকেই প্রমাণিত হয়, যুযুৎসু কখনওই ধর্মবিরুদ্ধ কিছু মেনে নেননি।
তাছাড়া, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রাক্কালে যখন কৌরব ও পাণ্ডবদের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠল, তখন যুযুৎসু কঠিন এক সিদ্ধান্ত নেন। তিনি রক্তের সম্পর্কের প্রতি আনুগত্য না দেখিয়ে ধর্মের পথে চলার সংকল্প নেন। যুদ্ধের প্রথম দিনেই তিনি প্রকাশ্যে কৌরব শিবির ত্যাগ করে পাণ্ডবদের শিবিরে যোগ দেন। এই সিদ্ধান্ত কেবল তার ব্যক্তিগত বিবেকের পরিচায়ক নয়, বরং মহাভারতের ধর্মযুদ্ধের প্রকৃত তাৎপর্যকেই তুলে ধরে।
যুদ্ধবিদ্যায় যুযুৎসু ছিলেন এক অতিরথী — যিনি একাই হাজার হাজার সৈন্যের বিরুদ্ধে লড়তে পারতেন। দুর্যোধন বাদে কৌরবদের মধ্যে তাঁর তুল্য যোদ্ধা আর ছিল না। তাই কৌরবপক্ষে থাকলে হয়তো পাণ্ডবদের জয় আরও বিলম্বিত হত। কিন্তু ন্যায়পথে অবিচল থেকে যুযুৎসু পাণ্ডবদের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং যুদ্ধ শেষে জীবিতও থাকেন।
মহাভারতের বিভিন্ন কাহিনি থেকে জানা যায়, কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধ শেষে পাণ্ডবরা মহাপ্রস্থানে যাওয়ার আগে হস্তিনাপুরের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে যুযুৎসুকেই নিয়োগ করেছিলেন। যদিও রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন অর্জুনের পৌত্র পরীক্ষিত, তবুও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার গুরুদায়িত্ব যুযুৎসুর কাঁধেই ন্যস্ত হয়েছিল। এভাবেই মহাভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অথচ অবহেলিত চরিত্র হিসেবে যুযুৎসু ইতিহাসে অমর হয়ে রয়ে গেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন — জন্ম নয়, কর্মই মানুষের পরিচয়। তিনি ছিলেন সেই বিরল বীর, যিনি আপন ভাইদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করেছেন শুধুমাত্র ধর্ম ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য।
অতএব নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ধৃতরাষ্ট্রের একমাত্র জীবিত পুত্র ছিলেন যুযুৎসু — যিনি ছিলেন এক নীরব নায়ক, যিনি ধর্ম ও বিবেকের প্রতীক হয়ে যুগে যুগে মহাভারতের পৃষ্ঠায় স্মরণীয় হয়ে থাকবেন ।