নিজস্ব প্রতিনিধি, গোপালগঞ্জ: বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সমাধি রক্ষা করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর এলোপাথাড়ি গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন ছয় জন। তাতেও ভীত নন বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান গোপালগঞ্জের বাসিন্দারা। বরং সদর্পে তাঁরা ঘোষণা করেছেন, ‘শেখ মুজিবের সমাধি রক্ষায় আরও রক্ত দেব।’ আর ওই ঘোষণার পরেই গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে যৌথভাবে নেমেছে। গত দু’দিন ধরে গোপালগঞ্জের বাড়ি-বাড়ি গিয়ে সেনা ও পুলিশ সাধারণ মানুষকে শাঁসাতে শুরু করেছে। হুমকি দিয়ে বলছে, ‘শেখ মুজিবের নাম ভুলে যা। বাঁচতে চাইলে মুজিবের নাম উচ্চারণও করবি না। তাহলে লাশ বানিয়ে দেব।’ ওই শাসানিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি তথা ইসলামী ছাত্র শিবিরের প্রাক্তন নেতা রেজাউল মল্লিক। যদিও পুলিশ এবং সেনাবাহিনী বাড়ি-বাড়ি গিয়ে কোনও হুমকি দিচ্ছে না বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর কবর গুঁড়িয়ে দেওয়ার কর্মসূচি নিয়েছিল পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের মদতপুষ্ট জাতীয় নাগরিক পার্টি। দলটির অন্যতম শীর্ষ নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ ও নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারি গত কয়েকদিন ধরেই হুঙ্কার দিয়েছিলেন, ৩২ নম্বর ধানমন্ডির মতোই গুড়িয়ে দেওয়া হবে বঙ্গবন্ধুর কবর। পাকিস্তান ভাঙার মূল নায়কের কোনও চিহ্ন রাখা হবে না বদলের বাংলাদেশে। পাল্টা হুঙ্কার ছেড়েছিলেন গোপালগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীরা। বঙ্গবন্ধুর কবরের একটি ইটে হাত দিলে রক্তগঙ্গা বইয়ে দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধুর কবর গুঁড়িয়ে দেওয়ার কর্মসূচি যাতে নির্বিঘ্নে পালিত হয় তার জন্য সক্রিয় হয়েছিল পুলিশ ও প্রশাসন। এনসিপির কর্মসূচিতে সহায়তা করতে বুলডোজার-সহ কবর ভাঙার যাবতীয় সরঞ্জাম জোগাড় করে রেখেছিল। এদিন সকালে পুলিশ ও প্রশাসন বঙ্গবন্ধুর কবর সংলগ্ন এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করতেই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা। পুলিশের সঙ্গে দফায়-দফায় সংঘর্ষ বাঁধে তাদের। এর পরে গোপালগঞ্জ শহরের পৌর পার্ক ও লঞ্চঘাট, গান্ধিয়াশুর, উলপুর, গোপালগঞ্জ চৌরাস্তা, পুরাতন বাসস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানপন্থী এনসিপি’র কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘর্ষে কার্যত রণক্ষেত্রে পরিণত হয় গোটা এলাকা। এনসিপির সভার জন্য জড়ো করা চেয়ার রাস্তায় এনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও সেনাবাহিনী সাউন্ড গ্রেনেড, রবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। তবুও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। গত ৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার হোতা আবদুল হাসনাত, সারজিস আলম ও নাহিদ ইসলাম সমাবেশস্থলে পৌঁছনো মাত্র ফের শুরু হয় ঝামেলা। আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীদের রণংদেহী মূর্তি দেখে ঊর্ধ্বশ্বাসে পালাতে থাকে আইএসআইয়ের চররা। নাহিদদের তাড়া করে কয়েক হাজার আওয়ামি লীগ নেতা-কর্মী ও স্থানীয় মানুষ। প্রাণ বাঁচাতে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আশ্রয় নেন এনসিপি নেতারা।
আওয়ামী লীগ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মধ্যে সংঘর্ষে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে গান্ধিয়াশূর। আচমকাই জাতীয় নাগরিক পার্টির সমর্থকদের পক্ষ নিয়ে আওয়ামী লীগ কর্মীদের মিছিলের উপরে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে সেনাবাহিনী। গুলিতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় পাঁচ জনের। তার মধ্যে চার জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছিল। তাঁরা হলেন গোপালগঞ্জ শহরের উদয়ন রোডের বাসিন্দা দীপ্ত সাহা (২৫), কোটালীপাড়ার রমজান কাজী (১৮), টুঙ্গীপাড়ার সোহেল রানা (৩০) ও গোপালগঞ্জ সদরের ইমন (২৪)। গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রথমে গোপালগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন সুমন বিশ্বাস ও রমজান মুন্সি নামে দুই আওয়ামী লীগ সমর্থক। অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজে স্থানান্তরিত করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ওই অমানবিক আচরণের ভিডিও ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যদিও আওয়ামী লীগের মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনাকে সঠিক সিদ্ধান্ত হিসাবেই আখ্যা দিয়েছে সেনা সদর দফতর। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল শফিকুল ইসলামের কথায়, ‘বদলের বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কোনও জায়গা নেই। আওয়ামী লীগ যারা করবে, তাদের এভাবেই ঝাঁঝরা করে দেওয়া হবে।’
শুধু গুলি চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের খুনিবাহিনী। গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়া আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের গলা বুট দিয়ে পিষে দিয়ে তিন জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে। গোপালগঞ্জ হাসপাতালে ঢুকে গুলিবিদ্ধ আওয়ামী লীগ কর্মীদের টেনেহিঁচড়ে বের করে নৃশংসভাবে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। বাংলাদেশ সেনার ওই খুনিরূপের ছবি ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা সেনার ভূমিকার নিন্দা করে বলেছেন, ‘এদিন গোপালগঞ্জে মানবাধিকারকে গণধর্ষণ করেছে জামায়াত ইসলামীর কট্টর সমর্থক জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের ভাড়াটে খুনিরা। অতীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর এমন নৃশংসতা দেখা যায়ন।’ সেনাবাহিনীর নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় গোপালগঞ্জজুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে চলছে কার্ফু।
অন্যদিকে, গোপালগঞ্জে নিরস্ত্র জনতার উপরে সেনার নির্বিচারে গুলিতে জখম আরও একজনের মৃত্যু হয়েছ। গতকাল বৃহস্পতিবার (১৭ জুলাই) গভীর রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন রমজান মুন্সি নামে গুলিবিদ্ধ এক আওয়ামী লীগ কর্মী। এ নিয়ে সেনার গুলিতে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। যদিও বেসরকারি মতে মৃতের সংখ্যা ২৩। বাকিদের লাশ মধুমতী নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়েছে সেনা সদস্যরা।