পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : ওরে গৃহবাসী খোল্, দ্বার খোল্, লাগল যে দোল।
স্থলে জলে বনতলে লাগল যে দোল।
দ্বার খোল্, দ্বার খোল্॥
আজ দোল উৎসব—রংয়ের উন্মাদনায় মেতে উঠেছে গোটা দেশ। আবির, গুলাল ও নানা রঙের ছোঁয়ায় মাতোয়ারা উচ্চ নিচ নির্বিশেষে আপামর হিন্দু। বিভিন্ন জায়গায় মানুষ আজ রং খেলায় মেতে ওঠেছেন, আর এর ফলে প্রতিবারের মতই বাজারে রংয়ের ব্যবসাও চরমে পৌঁছেছে । বিভিন্ন মূল্যের আবিরও বাজারে পাওয়া যাচ্ছে, যার মধ্যে হার্বাল আবিরের দাম অন্যান্য আবিরের তুলনায় সামান্য বেশি। কিন্তু জানেন কি? বিশ্বের সবচেয়ে দামি রং কোনটি? এমন কী, সেই রংয়ের দামের কাছে সোনার দামও ফেল এবং এটি এতটাই বিরল যে ধনী ব্যক্তিরাও এটি কেনার আগে শতবার ভাববেন।
গুগলে (Google) সার্চ করলে বিশ্বের সবচেয়ে দামি রঙের তালিকায় সবচেয়ে উপরে থাকবে ল্যাপিস লাজুলি থেকে তৈরি হওয়া নীল রং। এটি এক অতি মূল্যবান রং, যা ল্যাপিস লাজুলি (Lapis Lazuli) নামক এক বিশেষ পাথর থেকে প্রস্তুত করা হয়। এই পাথরকে গুঁড়ো করে রং তৈরি করা হত, যা অতীতে কিংবদন্তি শিল্পীদের পছন্দের ছিল।
জানা যায়, রেনেসাঁ যুগের বিখ্যাত চিত্রশিল্পীরা, যেমন মাইকেলেঞ্জেলো, এই রং তাঁদের শিল্পকর্মে ব্যবহার করতেন। এই রং এতটাই দুষ্প্রাপ্য ছিল যে, কোনও চিত্রশিল্পী যদি এটি ব্যবহার করতে চাইতেন, তবে তাঁকে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হত। কারণ, এই রং সংগ্রহ ও উৎপাদন করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।
কেন ল্যাপিস লাজুলি এত বিরল ও ব্যয়বহুল?
ল্যাপিস লাজুলি মূলত একটি সেমিপ্রেসিয়াস স্টোন, যা আফগানিস্তানের পার্বত্য অঞ্চলে পাওয়া যায়। এই পাথর গুঁড়ো করে নীল রং তৈরি করা হত, কিন্তু এই প্রক্রিয়া খুবই জটিল ও সময়সাপেক্ষ ছিল।
- এক ক্যারেট ল্যাপিস লাজুলির দাম প্রায় ১১ হাজার টাকা।
- এক গ্রাম ল্যাপিস লাজুলির দাম ৮৩ হাজার টাকারও বেশি।
- এটি প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতিতে নয়টি পবিত্র রত্নের (নবরত্ন) মধ্যে একটি।
- সংস্কৃতে এটি লাজবর্দ বা রাজাবর্ত নামে পরিচিত।
প্রাচীনকালে এটি মূলত পাণ্ডুলিপি লেখার জন্য ও চিত্রকলার কাজে ব্যবহৃত হত। গবেষকরা জানিয়েছেন, শুধুমাত্র ধনী লেখক ও চিত্রশিল্পীরাই এটি ব্যবহার করতে পারতেন।
ল্যাপিস লাজুলির বিকল্প ও আধুনিক উৎপাদন
১৮২০ সালের শেষের দিকে, ফ্রান্স ও জার্মানিতে কৃত্রিম উপায়ে সিন্থেটিক আল্ট্রামেরিন উৎপাদন শুরু হয়। এটি ল্যাপিস লাজুলির বিকল্প রং হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
শাস্ত্রমতে ল্যাপিস লাজুলির গুরুত্ব
- এই রত্নের ধর্মীয় ও জ্যোতিষশাস্ত্রীয় গুরুত্ব অপরিসীম।
- শনি গ্রহের উচ্চ অবস্থানের ক্ষেত্রে এটি ধারণ করা শুভ বলে মনে করা হয়।
- মকর ও কুম্ভ রাশির জাতকদের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী।
- যদিও দোল উৎসবে ব্যবহৃত আবির ও গুলালের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যেই থাকে, তবুও বিশ্বের সবচেয়ে দামি রঙ ল্যাপিস লাজুলি থেকে তৈরি নীল রং। একসময় এটি চিত্রশিল্প ও রাজকীয় শিল্পের জন্য ব্যবহৃত হত, তবে বর্তমানে এটি অত্যন্ত বিরল এবং মূলত সংগ্রাহকদের জন্য সংরক্ষিত।