নিজস্ব প্রতিনিধি: সনাতন ধর্ম অপরিসীম জ্ঞানের আধার। এই ধর্মীয় শাস্ত্রে এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিদ্যমান, যা অধিকাংশই আমাদের অজ্ঞাত। জানা যায়, এই ধর্মে সকল দেবতা ও তাঁদের দেবীরা একই আধারভূত, যাঁরা একে অপরের পরিপূরক। ঠিক যেমন পার্বতী ছাড়া হর অর্থাৎ দেবাদিদেব মহাদেব অপরিপূর্ণ, ঠিক তেমনই জগৎপালক ভগবান বিষ্ণু ও মা লক্ষ্মী পরস্পরের একান্ত পরিপূরক। বিষ্ণু রক্ষা ও শৃঙ্খলার প্রতীক; অন্যদিকে লক্ষ্মী দেবী সম্পদ, সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী। তাঁদের যুগলবন্দি চিরন্তন, যার গভীর তাৎপর্য আছে বৈদিক ও পুরাণীয় সাহিত্যে। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন বহু শাস্ত্রজ্ঞের মনে উদিত হয়েছে — কেন লক্ষ্মীদেবী সবসময় ভগবান নারায়ণের পায়ের কাছে বসেন? শুধু তাই নয়, কেন তিনি পদসেবা করেন?
পৌরাণিক কাহিনী থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, ঠিক এই প্রশ্নই একদিন মা লক্ষ্মীকে স্বয়ং দেবর্ষি নারদ করেছিলেন। লক্ষ্মীদেবী তাঁর সেই প্রশ্নের যে জবাব দিয়েছিলে, তার মধ্যেই নিহিত রয়েছে এই আচার বা প্রতীকের গভীর দার্শনিক ও সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা।
নারদের প্রশ্ন ও লক্ষ্মীর উত্তর
পুরাণ অনুসারে, একবার দেবর্ষি নারদ বৈকুণ্ঠধামে গিয়ে লক্ষ্মীদেবীকে ভগবান বিষ্ণুর চরণে বসে থাকতে দেখেন। কৌতূহল বশে তিনি জানতে চান, কেন সর্বময়ী, সর্বপ্রভা, ধন-সম্পদের দেবী, একজন পরমপুরুষের পায়ের কাছে নিজেকে অবনত করেন?
তখন লক্ষ্মী দেবী জানিয়েছিলেন —
“দেবগুরু বৃহস্পতি বিরাজ করেন নারীর হাতে, আর দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য পুরুষের পায়ে। আমি নারায়ণের চরণে থাকি, কারণ তাঁর পাদপদ্ম স্পর্শেই মঙ্গল, কল্যাণ ও শুদ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে। আমি চিরশুদ্ধ এবং শুভদায়িনী। তাই চিরসত্তা ভগবানের পদসেবাতেই আমি স্থিত।”
পদসেবার আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ
ভগবানের চরণ পৌরাণিক শাস্ত্রে পরম পবিত্র। বিষ্ণুর পাদপদ্মকে ‘পঙ্কজ’ বা পদ্মসম বলা হয় — যেমন গঙ্গা উৎপন্ন হয়েছিল বিষ্ণুর পদতল থেকে, তেমনই লক্ষ্মীও পদে থেকেই সর্বজগতে সৌভাগ্য বিলিয়ে দেন। পদসেবা মানে আত্মসমর্পণ, প্রেম ও বিনয়ের প্রকাশ। লক্ষ্মী শুধু ভক্তের কাছে নয়, ঈশ্বরের কাছেও নিজেকে সেবাদাসীতে রূপান্তর করে সংসারে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তা ছাড়া বৃহস্পতি স্থিত সেই হাতে স্বামীর পদসেবা করলে সেই নারীর ওপর সন্তুষ্ট হন দেবী লক্ষ্মী।
আচারিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ
ভারতীয় পরিবারে গৃহিণীকে “গৃহলক্ষ্মী” বলা হয়। সংসারে শান্তি, শৃঙ্খলা, সৌভাগ্য ও ঐশ্বর্য ধরে রাখতে গৃহলক্ষ্মী যেমন বিনয়, সহমর্মিতা ও কর্তব্যপরায়ণতা রক্ষা করেন, লক্ষ্মীর নারায়ণপদে বসাও সেই ত্যাগ ও দায়িত্বের প্রতীক।
এই প্রতীকটি আমাদের শেখায় — “ক্ষমতা মানে অহংকার নয়, বরং সহনশীলতা ও সেবার মানসিকতা।”
নারায়ণ ও লক্ষ্মীর সম্পর্কের দর্শন
ভগবান নারায়ণ যেখানে বিশ্বরক্ষার প্রতীক, সেখানে লক্ষ্মী হলেন সেই রক্ষার প্রয়োজনীয় শক্তি ও সংস্থান। নারায়ণ কর্মের কেন্দ্রবিন্দু, আর লক্ষ্মী সেই কর্মে অনুপ্রেরণা ও সমর্থন।
পদসেবা এখানে কর্তৃত্বের প্রতীক নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভক্তির মহিমা। লক্ষ্মী তাঁর আচার দিয়ে দেখিয়ে দেন, পরম পুরুষের সেবা করাই জীবনের পরম উদ্দেশ্য।
মা লক্ষ্মীর নারায়ণপদে বসা কেবল একটি দৃশ্য নয়, এটি একটি গভীর তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক সত্যের প্রতীক। এটি শিক্ষাদেয় — যেখানে অহং থাকে না, সেখানেই সত্যিকারের সৌভাগ্য স্থায়ী হয়। পদসেবা মানে নত হওয়া নয়, বরং নিজেকে ঈশ্বরসেবায় নিবেদিত করে মহত্ত্বের পথে এগিয়ে যাওয়া। এ কারণেই লক্ষ্মী দেবী চিরকাল নারায়ণের পদপ্রান্তে বসে থাকেন — সংসারকে শিক্ষা দেন প্রেম, বিনয় ও পূর্ণ আত্মসমর্পণের মাহাত্ম্য।