নিজস্ব প্রতিনিধি: বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটা। আমাদের এলাকার পার্কিং জোনে হঠাৎ একটা গাড়ি এল। কী দুর্দান্ত গাড়ি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, অন্তত পঁচাত্তর আশি লক্ষ টাকার একটা বিএমডাব্লিউ। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই পাড়ার সারমেয় সমিতির বিশেষ সদস্য ভুলু এসে সামনের চাকাটা একবার শুঁকেই পেছনের এক পা তুলে দিব্যি গাড়িটার সামনের চাকায় মূত্র বিসর্জন করে চলে গেল। এমন ঘটনা নতুন নয়। ইতোমধ্যে প্রায় সকলেরই চোখে পড়েছে।
আমাদের চারপাশে প্রতিদিনই ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা আমাদের মনে কৌতূহল জাগায়। যেগুলির মধ্যে কুকুরের এই নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় — যেমন – গাড়ির টায়ার এবং বিদ্যুতের খুঁটির গোড়ায় — প্রস্রাব করা উল্লেখযোগ্য। কেউ কেউ ভাবেন এটি হয়তো নিছকই কুকুরদের অপরিষ্কার স্বভাব। তবে ভেবে দেখেছেন কী? কেন কুকুরেরা এই সমস্ত বিশেষ জায়গায় প্রস্রাব করে থাকে ! পশু আচরণ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে রয়েছে কুকুরদের সহজাত প্রবৃত্তি এবং সামাজিক আচরণের গভীর কারণ।
এলাকা চিহ্নিতকরণের প্রয়োজনে প্রস্রাব
কুকুরদের একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হল নিজেদের এলাকা বা অঞ্চল চিহ্নিত করে রাখা। তারা যে এলাকায় বসবাস করে, সেই এলাকা অন্যদের জানান দেওয়ার জন্য কুকুরেরা বিশেষ এক পদ্ধতি ব্যবহার করে, সেটি হল প্রস্রাব। প্রস্রাবে থাকে একধরনের ঘ্রাণচিহ্ন, যা অন্য কুকুরেরা সহজেই ঘ্রাণশক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করতে পারে। এইভাবে তারা বুঝে নেয়, ঐ এলাকায় কোন কুকুর রয়েছে বা কার এলাকা এটি। এই পদ্ধতিতেই তৈরি হয় কুকুরদের অদৃশ্য সীমারেখা। তাই যে কোনও জায়গা নয়, তারা এমন স্থান বেছে নেয়, যা সহজেই দেখা যায় এবং গন্ধ অনেকক্ষণ থাকে।
কেন এই গাড়ির টায়ার এবং বিদ্যুতের খুঁটি?
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, কুকুররা সাধারণত উঁচু স্থানে প্রস্রাব করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এর দুটি প্রধান কারণ —
- গন্ধ সহজে ছড়িয়ে পড়া
- বাকি কুকুরদের নাকের উচ্চতায় থাকা
উঁচু জায়গায় প্রস্রাব করলে সেটি সহজেই অন্য কুকুরের নজরে পড়ে এবং গন্ধও বেশি ছড়ায়। বিদ্যুতের খুঁটি, গাছের গোড়া, বাড়ির প্রাচীর, কিংবা গাড়ির টায়ার, — এই জায়গাগুলি তাই তাদের কাছে এলাকা চিহ্নিতকরণের আদর্শ স্থান।
টায়ারের প্রতি কুকুরদের বিশেষ আকর্ষণ কেন?
গাড়ির টায়ার শুধু উঁচু স্থান বলে নয়, এতে আরও এক বিশেষ গুণ রয়েছে — রবারের গন্ধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, রবারের বিশেষ গন্ধ কুকুরদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। সেই গন্ধের প্রতি কুকুরদের বিশেষ আকর্ষণ থাকার কারণেই তারা টায়ারের কাছে এসে বারবার গন্ধ নেয় এবং প্রস্রাব করে সেই গন্ধের সঙ্গে নিজেদের ঘ্রাণচিহ্ন মিশিয়ে দেয়।
এছাড়া, টায়ারের রাবার ঘ্রাণ এবং প্রস্রাবের গন্ধ মিশে দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়। ফলে অন্য কুকুররা সহজেই সেই গন্ধ শনাক্ত করতে পারে। অপরদিকে, মাটিতে বা সমতলে প্রস্রাব করলে বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় বা সহজেই গন্ধ উবে যায়। ফলে কুকুরদের পছন্দ উঁচু স্থানে এবং বিশেষত টায়ারের মতো জায়গায় প্রস্রাব করা।
বাইক বা গাড়ি ধাওয়া করার প্রবণতা
বাইকের পিছনে কুকুরদের ধাওয়া করাও এই এলাকার চিহ্নিতকরণের প্রবণতারই একটি অংশ। যখন কোনও গাড়ির টায়ারে প্রস্রাব করা হয়ে থাকে, এবং সেই গাড়িটি এলাকা ছেড়ে চলে যায়, তখন কুকুরদের মনে হয় তাদের চিহ্নিত এলাকা থেকে কোনও ‘অবাঞ্ছিত’ কিছু বেরিয়ে যাচ্ছে। সেই প্রবৃত্তি থেকেই শুরু হয় বাইক বা গাড়ি ধাওয়া করার প্রবণতা। এছাড়া, টায়ারের বিশেষ ঘ্রাণে আকৃষ্ট হয়েও অনেকসময় কুকুররা ধাওয়া করতে পারে।
তাই, বলা যায়, যা আমাদের চোখে অসুবিধা বা অস্বস্তিকর বলে মনে হয়, সেটি কিন্তু কুকুরদের স্বাভাবিক সামাজিক আচরণ এবং শারীরবৃত্তীয় প্রবৃত্তির প্রকাশ। গাড়ির টায়ার বা বিদ্যুতের খুঁটিতে প্রস্রাব করার মাধ্যমে কুকুররা নিজের এলাকা চিহ্নিত করে রাখে, দলীয় সংযোগ বজায় রাখে এবং নিজেদের উপস্থিতির জানান দেয়। এটা মূলত তাদের ভাষা, যা গন্ধের মাধ্যমে কাজ করে। কাজেই এ আচরণকে বিরক্তিকর মনে হলেও, এটা প্রকৃতির এক নিখুঁত নিয়ম — যা সারমেয় সমাজে নিঃসন্দেহে এক অপরিহার্য যোগাযোগের মাধ্যম।