পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : রঙের উৎসব দোলের ঠিক আগের দিন প্রচলিত রীতি মেনে সারা ভারতের বিভিন্ন স্থানে অশুভ শক্তিকে পুড়িয়ে শুভ শক্তির উদয় করার অভিপ্রায়ে হোলিকা দহন করা হয়। জানা যায়, বর্তমানে পাকিস্তানে অবস্থিত মুলতান অঞ্চলের প্রহ্লাদপুরী মন্দিরে প্রথম এই উৎসবের সূচনা হয়েছিল। প্রহ্লাদপুরী মন্দির পাকিস্তানের অন্যতম প্রাচীন হিন্দু মন্দির। ভক্ত প্রহ্লাদের নামানুসারে এই মন্দিরের নামকরণ করা হয় প্রহ্লাদপুরী মন্দির ও প্রাচীন কালে মন্দিরটি ভগবান নৃসিংহ দেবের উপাসনা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। কিংবদন্তি অনুসারে, এই স্থানেই নৃসিংহ দেব রাক্ষসরাজ হিরণ্যকশিপুকে বধ করে প্রহ্লাদকে রক্ষা করেছিলেন।
প্রাচীন ইতিহাস
মুলতান পূর্বে কাশ্যপপুর নামে পরিচিত ছিল। ঐতিহাসিকভাবে এই স্থানটি হিন্দু ও বৌদ্ধ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ভক্ত প্রহ্লাদ নৃসিংহ দেবকে নিবেদন করে এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। এটি মুলতানের দুর্গের উচ্চভূমিতে অবস্থিত এবং পরবর্তীকালে শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানে পরিণত হয়।
ধ্বংস ও পুনর্গঠন
যেমনটি মুলতানের সূর্য মন্দিরের ক্ষেত্রে ঘটেছিল, ঠিক তেমনই মুসলিম আক্রমণের ফলে প্রহ্লাদপুরী মন্দিরটিও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। মন্দিরটি বহু শতাব্দী ধরে তার আসল রূপ হারিয়ে ফেলে। তবে ১৯ শতকে পুনরায় মন্দিরটির নির্মাণকাজ সুসম্পন্ন করা হয়। শিখ সাম্রাজ্যের শাসন কালে মন্দিরটি পুনর্নির্মিত হয়। ১৮৩১ সালে বিখ্যাত ব্রিটিশ পর্যটক ও গবেষক আলেকজান্ডার বার্নস মন্দিরটি পরিদর্শন করেন এবং মন্তব্য করেন যে তখন এটি পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল এবং এর ছাদ ভেঙে গিয়েছিল।
এর পর ১৮৪২ সালে, ব্রিটিশরা যখন মুলতানের দুর্গে আক্রমণ চালায়, তখনও মন্দিরটি ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়। ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার কানিংহাম ১৮৫৩ সালে মন্দিরটি পরিদর্শন করেন এবং নথিভুক্ত করেন যে এটি একটি “বর্গক্ষেত্র আকৃতির ইটের মন্দির” ছিল। এরপর ১৮৬১ সাল নাগাদ বদল রাম দাস ১১ হাজার ভারতীয় টাকা ব্যয় করে এই মন্দির পুনরায় র্নির্মাণ করেছিলেন ও মন্দিরটি আবার হিন্দুদের উপাসনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।
বর্তমান অবস্থা
১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগের পর, পাকিস্তানের অধিকাংশ হিন্দু ভারতে চলে যায়। তবে পাকিস্তানে থাকা সংখ্যালঘু হিন্দুরা মন্দিরটি পরিচালনা করতেন। জানা যায়, মন্দিরে থাকা ভগবান নৃসিংহ দেবের মূল বিগ্রহ বাবা নারায়ণ দাস বাটরা ভারতে নিয়ে আসেন এবং বর্তমানে এটি হরিদ্বারের একটি মন্দিরে সংরক্ষিত রয়েছে।
জনশ্রুতি মতে, ১৯৯২ সালে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর পাকিস্তানে প্রতিশোধমূলক আক্রমণের অংশ হিসেবে ক্ষুব্ধ মুসলিম জনতা মুলতানের এই মন্দিরটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। বর্তমানে, মন্দিরটির ধ্বংসাবশেষই পড়ে রয়েছে।