নিজস্ব প্রতিনিধি, ঢাকা: চলতি বছরের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ভোটের আয়োজন করে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে মোল্লা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তদারকি সরকারকে। আজ বুধবার (২১ মে) ঢাকা সেনাঘাঁটিতে সেনা আধিকারিকদের এক বৈঠকে (পড়ুন ‘দরবার’) এ কথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। সেই সঙ্গে আমেরিকা ও জাতিসঙ্ঘের চাপে পড়ে আরাকান আর্মিকে আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহের জন্য বাংলাদেশের মাটিতে কোনও ‘মানবিক করিডর’ করতে দেওয়া হবে না বলেও সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন তদারকি সরকারের প্রতি। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় যে, এদিন দরবারে হাজির প্রায় সহস্রাধিক সেনা আধিকারিক ফের একবার সেনাপ্রধানের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন। এমনকি এও জানিয়ে দিয়েছেন ‘সেনাপ্রধান যে নির্দেশ দেবেন তা অক্ষরে-অক্ষরে পালন করার জন্য আত্মবলিদান দিতেই প্রস্তুত।’ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, ‘ডিসেম্বরের মধ্যে ভোটের বন্দোবস্থ না করলে বাংলাদেশে যে ফের সেনা শাসন জারি হবে তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন জেনারেল ওয়াকার।’
গত কয়েকদিন ধরেই রাখাইন প্রদেশের জন্য বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে মানবিক করিডর গড়া নিয়ে তদারকি সরকারের শীর্ষ মহলের সঙ্গে সেনাপ্রধান ওয়াকারের বিরোধ তুঙ্গে উঠেছে। গতকাল মঙ্গলবারই বিমান ও নৌবাহিনীর প্রধানকে নিয়ে তদারকি সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে দেখা করে হুমকি দিয়েছিলেন, ‘মানবিক করিডর নিয়ে ২৪ ঘন্টার মধ্যে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট জানাতে হবে দেশবাসীকে। ওই অবস্থানের পরেই তিন বাহিনী পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে।’ সেনাপ্রধানের ওই হুমকির পরেই এদিন সাংবাদিক সম্মেলন ডেকে মানবিক করিডর নিয়ে ডিগবাজি খান মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ’র এজেন্ট তথা জাতীয নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান। তিনি জানিয়ে দেন, ‘মানবিক করিডরের বিষয়ে কোনও দেশের সঙ্গে কোনও কথা হয়নি। সিদ্ধান্তও হয়নি।’
‘মানবিক করিডর’ ও সেন্ট মার্টিন দ্বীপ মার্কিন সেনাদের হাতে তুলে দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউনূস সরকার, তার প্রেক্ষিতে কী করা হবে, তা নিয়ে কথা বলতে সেনা আধিকারিকদের ‘দরবার’ ডেকেছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ জামান। ঢাকা সেনানিবাসে ওই দরবারে হাজির ছিলেন বিভিন্ন পর্যায়ের ১,২০০ আধিকারিক। ‘দরবার’-এ প্রথম থেকেই ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়ান সেনাপ্রধান।
সূত্রের খবর জেনারেল ওয়াকার হুঙ্কার ছেড়ে বলেন, ‘দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা নষ্ট করে কাউকে কোনও মানবিক করিডর করতে দেওয়া হবে না। সেনাকে অন্ধকারে রেখে অনির্বাচিত সরকার যে মানবিক করিডর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সফল হতে দেওয়া হবে না। সরকার সেনাবাহিনীর মধ্যে ফাটল ধরাতে কিছু দালালকে (পড়ুন লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফাইজুর রহমান ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসান) আসরে নামিয়েছে। ওই দালালদের সব ষড়যন্ত্র ভেস্তে দেব।’0 দেশে জাতীয় নির্বাচন করা নিয়ে ইউনূস সরকারের টালবাহানা যে সেনাবাহিনী মানবে না, তা স্পষ্ট করে দিয়ে জেনারেল ওয়াকার বলেন, ‘ডিসেম্বরের মধ্যেই ভোট করাতে হবে। কোনও অজুহাত শোনা হবে না। ‘নির্বাচিত সরকার’ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। দেশ কোনও পথে এগোবে তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচিত সরকার। এমন প্রশাসন নয়, যাঁদের জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয় না।’
পাশাপাশি দেশে চলা ‘মব ভায়োলেন্স’ বা ‘মবের মুল্লুক’ নিয়েও সরব হয়েছেন সেনাপ্রধান। অধস্তন আধিকারিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘গত কয়েক মাস ধরে দেশে মবের মুল্লুক চলছে। সেনাবাহিনী আর এই অনাচার সহ্য করবে না। সরকার কিংবা পুলিশ কী বলছে তা শুনবেন না। কঠোর ব্যবস্থা নেবেন। মব ভায়োলেন্সের সঙ্গে জড়িতদের এমন শিক্ষা দেবেন যে আগামী কয়েক প্রজন্ম এই ধরনের অপরাধ করার সাহস না দেখাতে পারেন।’ এদিনের ‘দরবার’-এ হাজির এক শীর্ষ সেনা আধিকারিক বলেন, ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ভুলিয়ে দেওয়ার যে ষড়যন্ত্র চলছে তা নিয়ে সরব হয়ে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকে কোনওভাবে খাটো করে দেখানো যাবে না মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান মেনে নেওয়া হবে না।’