পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : ওঁ হ্লীঁ বগলামুখী সর্বদুষ্টানাং বাচং মুখং পদং স্তম্ভায় জিহ্বাং কীলয় বুদ্ধিং বিনাশয় হ্লীঁ ওঁ স্বাহা ।।
তিনি অন্যতম মহাবিদ্যা। অপরূপা সুন্দরী। অপার করুণাময়ী। তিনি গম্ভীরা, তিনি মদোন্মত্তা। গায়ের রং ঠিক যেন তপ্ত স্বর্ণের মতন। তিনি চতুর্ভুজা, ত্রিনয়না ও কমলাসনে উপবিষ্টা। তাঁর দক্ষিণ হস্তে মুদ্গর ও পাশ এবং বামহস্তে শত্রুর জিহ্বা ও বজ্র। তাঁর কানে স্বর্ণকুণ্ডল ও ললাটে পীতবর্ণ অৰ্দ্ধচন্দ্র। তিনি পীতবস্ত্র পরিহিতা এবং স্বর্ণসিংহাসনে অধিষ্ঠিতা। তিনি হলেন দেবী বগলামুখী, যিনি ভক্তের মানসিক ভ্রান্তি ও শত্রু নাশের দেবী।
জানা যায়, হিন্দু ধর্মের দশমহাবিদ্যার মধ্যে অষ্টম স্থানাধিকারী দেবী হলেন বগলামুখী। তাঁকে বলা হয় স্তম্ভন শক্তির দেবী—অর্থাৎ যিনি শত্রুর বাক্য, বুদ্ধি ও কার্যক্ষমতাকে স্তম্ভিত করে দিতে পারেন। বগলামুখী নামের অর্থ—“যিনি মুখ ধরে স্তম্ভিত করেন”। শব্দটির মূল “বগলা” মানে ধরা ও “মুখ” অর্থাৎ মুখ; অর্থাৎ যিনি শত্রুর বাক্য বা কথাকে থামিয়ে দিতে সক্ষম।
দেবী বগলামুখীর প্রতিমা ও বৈশিষ্ট্য
বগলামুখী দেবী সাধারণত দ্বিভূজা রূপে পূজিতা হন। এক হাতে তিনি গদা ধারণ করেন যার দ্বারা শত্রুকে আঘাত করেন, অপর হাতে শত্রুর জিহ্বা ধরে তাঁকে বাকরুদ্ধ করেন। এই মূর্তি দর্শনে শক্তির প্রকাশ ও স্তম্ভনের তাৎপর্য প্রকাশিত হয়। ভক্তরা দেবীর এই রূপের পূজা করেন শত্রুনাশ, বাকসিদ্ধি, মামলা জয়, রাজনীতিতে সফলতা ও বিতর্কে জয়লাভের জন্য। তিনি ‘পীতাম্বরা’ বা ‘হলুদবস্ত্রধারিণী’ নামেও পরিচিতা, কারণ তাঁর প্রতিটি উপাদান—বস্ত্র, অলংকার, মালা—সবই হলুদ বর্ণের।
বগলামুখীর জন্মকথা: বিভিন্ন পুরাণ ও তন্ত্র মতানুসারে
১. ব্রহ্মার তপস্যার ফলশ্রুতি
একবার বিশ্বজগতে বিশৃঙ্খলা ও বিনাশের আশঙ্কা দেখা দিলে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পড়েন। সব চেষ্টা করেও তিনি জগতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থ হন। তখন তিনি ত্রিপুরাম্বিকা দেবীর তপস্যা শুরু করেন। ত্রিপুরাদেবী তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে পীতবর্ণের এক অলৌকিক হ্রদের মধ্যে থেকে এক জ্যোতির্ময়ী দেবীর আবির্ভাব ঘটান। এই পীতবর্ণা দেবী হলেন বগলামুখী। তাঁর আবির্ভাবে বিশ্বে শান্তি ও স্থিতির সঞ্চার হয়।
২. দুর্গমাসুরের উপাখ্যান
আরও এক কাহিনিতে বলা হয়েছে, অসুর রুরু-র পুত্র দুর্গম দীর্ঘ তপস্যা করে ব্রহ্মার কাছ থেকে অমোঘ বরলাভ করে। এতে দেবতারা আতঙ্কিত হন এবং তারা ভগবতী দেবীর শরণাপন্ন হন। ভগবতী দেবী তখন পীত সমুদ্র বা হ্রদ থেকে বগলামুখী রূপে আবির্ভূত হন এবং দুর্গমাসুরকে স্তম্ভিত করে দেবতাদের বিপদ থেকে রক্ষা করেন।
৩. বায়ু স্তম্ভনের কিংবদন্তি তন্ত্র গ্রন্থে আছে, সত্যযুগে একবার প্রবল বায়ুপ্রবাহে সৃষ্টির ধ্বংসের আশঙ্কা দেখা দেয়। তখন বিষ্ণু কঠোর তপস্যা করেন বায়ু থামানোর জন্য। তাঁর তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে ত্রিপুরাদেবী বায়ুকে স্তম্ভিত করেন। এরপর তিনি হরিদ্রা নামক হ্রদে জলক্রীড়া করতে থাকেন ও সেই হ্রদের তীরে সৌরাষ্ট্রে, মঙ্গলবার কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে, অর্ধরাত্রে, উজ্জ্বল জ্যোতির্ময়ী বগলামুখী দেবীর আবির্ভাব ঘটে। এই বিশেষ রাত্রিকে ‘বীররাত্রি’ বলে। এই রাত্রিতে বগলামুখী বিশেষভাবে পঞ্চমকার উপাসনায় সন্তুষ্ট হন।
বগলামুখী ও তন্ত্র সাধনা
তন্ত্র সাহিত্যে বগলামুখীর বিশেষ স্থান রয়েছে। এখানে তিনি পরিচিত সিদ্ধবিদ্যা বগলাম্বিকা নামে। তাঁকে তন্ত্রের বীজশক্তি হিসেবে ধরা হয়, যিনি বাক্য, চেতনা, বুদ্ধি, জ্ঞান, শক্তি—সব স্তম্ভিত করতে পারেন। এই কারণে বগলামুখী সাধনার মাধ্যমে ভক্তরা শত্রু, আদালত মামলা, বিতর্ক, রাজনৈতিক শত্রুতা, ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রভৃতিতে সফলতা লাভের আশায় পূজা করেন। তিনি অগ্নি-সম উজ্জ্বল পীতবর্ণের এবং তাঁর শক্তি বিষ্ণুর তেজের সঙ্গে মিশ্রিত বলে তিনি বৈষ্ণবী শক্তি রূপে পূজিতা। দেবীর এই শক্তিতে শুধু পৃথিবী নয়, স্বর্গলোকও স্তম্ভিত হয়—এমনটাই তন্ত্র গ্রন্থের বর্ণনা।
বগলামুখীর আখ্যানের তাৎপর্য
বগলামুখীর আবির্ভাব কাহিনির মূল বার্তা হল—বিশ্ব যখন বিশৃঙ্খলার মুখে, তখন স্থিতির জন্য শক্তির প্রয়োজন হয়। দেবী বগলা সেই শক্তিরই মূর্ত প্রতীক, যিনি শুধু ধ্বংস করেন না, বরং নিয়ন্ত্রণ করেন, স্তম্ভিত করেন ও সাম্য ফেরান। তাই তাঁকে “ব্রহ্মাস্ত্ররূপিণী” বলা হয়— যিনি স্বয়ং এক পরম অস্ত্র, যিনি সর্বশেষ রক্ষাকবচ।
তাই নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, দেবী বগলামুখীর আবির্ভাব কাহিনির মূল ভাব হল—স্তম্ভন শক্তির জাগরণ। তিনি শত্রুকে স্তম্ভিত করেন, বিপদকে নিবারণ করেন, বাকশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তাই শত্রুভয় মুক্তি, আদালত মামলা জয়, বাকসিদ্ধি ও আত্মরক্ষা—এই সব কামনায় তাঁর উপাসনা আজও সমান জনপ্রিয়। দেবী বগলা কেবল শক্তির প্রতীক নন, তিনি বিপরীত শক্তিকে পরিবর্তন ও স্থিতির দেবী, যাঁর কৃপায় বিশ্বধর্মিতার এক অসাধারণ উদাহরণ পাওয়া যায়।