পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : সকাল থেকেই পেট ভার, সারাক্ষণ গুর গুর করছে। ইতোমধ্যে চারবার বাথরুম যাওয়া আসা হয়ে গিয়েছে। কর্মসূত্রে আবার একটু বাইরে যেতে হবে। কিছুক্ষণ পরেই ট্রেন । স্টেশনে পৌঁছে ট্রেনে উঠেই দেখলাম ট্রেনের কামরায় আবার কোনও টয়লেট নেই। এত “গোদের ওপর বিষফোঁড়া” ! ট্রেনে ছাড়তে না ছাড়তেই পেট ভুট-ভাট আর মোচড় মারা শুরু করল। অনেকক্ষণ বেগ চেপে রাখার পরে ট্রেন একটা স্টেশনে এসে দাঁড়াল। সাথে সাথে নেমেই দৌড় দিলাম। কিন্তু, প্রকৃতির ডাক সারতে সারতে ট্রেনের হুইসেল বেজে গেল। ছেড়ে দিল ট্রেন। কী? অবাক হচ্ছেন তো! যে, কী উল্টোপাল্টা বলছি। হ্যাঁ, এটা গল্প হলেও সত্যি। ঠিক এমনই এক ঘটনার মধ্য দিয়ে ভারতীয় রেলে ট্রেনের কামরায় বাথরুমের শুভ সূচনা হয়েছিল।
আজকের দিনে আমরা যখন ট্রেনে যাত্রা করি, তখন টয়লেট ব্যবহার করাটা যেন একেবারেই স্বাভাবিক এবং আবশ্যিক। কিন্তু, ভাবলে অবাক হতে হয়, একটা সময় ছিল, তখন ভারতীয় রেলে টয়লেটই ছিল না। ১৯০০ সালের গোড়ার দিকে ভারতের ট্রেনযাত্রায় এই সুবিধার কোনও অস্তিত্বই ছিল না। আর এই ব্যবস্থার পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে একজন সাধারণ বাঙ্গালী যাত্রীর লেখা এক অসাধারণ ঐতিহাসিক চিঠি – যা শুধু রেলের নয়, সামাজিক বাস্তবতাকেও বদলে দিয়েছিল।
কেমন ছিল এই ঘটনা?
ভারতে প্রথম যাত্রীবাহী ট্রেনের যাত্রা শুরু হয় ১৮৫৩ সালের ১৬ এপ্রিল। মুম্বই (তৎকালীন বম্বে) থেকে থানে পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৪ কিমি পথে। তবে সেই সময়ের ট্রেনগুলোতে কোনও টয়লেট ছিল না। দীর্ঘ যাত্রায় যাত্রীদের জন্য এটি ছিল চরম অস্বস্তির বিষয়। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যাঁরা ট্রেনের সাধারণ শ্রেণিতে যাতায়াত করতেন, তাঁদের জন্য এটি ছিল এক অগ্নিপরীক্ষা।
এক অসাধারণ চিঠি – এক বড় পরিবর্তন
এই অভাবনীয় সমস্যার বিরুদ্ধে প্রথম আওয়াজ তোলেন অখিল চন্দ্র সেন, যিনি ১৯০৯ সালে ট্রেনযাত্রার সময় এই বাস্তব সমস্যার সম্মুখীন হন। জানা যায়, তিনি বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে কাঁঠাল খেয়েছিলেন, ফলে ট্রেনে ওঠার পর থেকেই পেট গুড়গুড়। যা হোক করে চেপেচুপে বসেছিলেন তিনি। যখন আহমেদপুর স্টেশনে ট্রেন থামল, প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে তিনি নিচে নামেন। কী আর করা যায়! লাইনের পাশেই তিনি বসে পড়েন মলত্যাগ করতে। কিন্তু ২ মিনিটে কী আর পেট পরিষ্কার হয় ? এমন সময় গার্ড হুইসল বাজিয়ে দিল আর, তখনই ট্রেন ছেড়ে দেয়। অখিল বাবু ধুতি ধরে ও মাটির পাত্র হাতে নিয়ে ট্রেনের পেছনে দৌড়ান, কিন্তু ট্রেন ধরতে ব্যর্থ হন এবং পড়ে যান।
এই অপমান ও অস্বস্তির অভিজ্ঞতার পরে তিনি সাহেবগঞ্জ রেল দফতরে একটি ক্ষুব্ধ চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যবস্থার অভাব রয়েছে রেলের মতো বিশাল পরিষেবায়। তাঁর চিঠি ছিল সংক্ষিপ্ত, তীব্র অথচ যুক্তিপূর্ণ।
চিঠির প্রভাব ও টয়লেটের সূচনা
অখিল চন্দ্র সেনের এই চিঠি ব্রিটিশ রেল প্রশাসনের নজরে আসে। তখন থেকেই ভারতীয় রেল কর্তৃপক্ষ এই সমস্যাটির গুরুত্ব বুঝতে শুরু করে। ১৯০৯ সাল থেকেই ধাপে ধাপে ট্রেনের কোচে টয়লেট স্থাপনের কাজ শুরু হয়। প্রথমে শুধুমাত্র উচ্চ শ্রেণির কোচে এই সুবিধা দেওয়া হয়, কিন্তু পরবর্তী কয়েক দশকের মধ্যেই তা সব শ্রেণিতে সম্প্রসারিত হয়।
টয়লেট ছাড়া কেমন ছিল সেই ট্রেন ভ্রমণ?
প্রাচীন ট্রেন যাত্রায় যাত্রীরা তাদের প্রাকৃতিক চাহিদা মেটানোর জন্য স্টেশনে দীর্ঘ বিরতির অপেক্ষায় থাকতেন। অনেক সময় যাত্রীরা স্টেশনের বাইরে গিয়ে প্রয়োজন মেটাতেন। এতে শুধু স্বাস্থ্যহানি হত না, লজ্জাজনক পরিস্থিতির সম্মুখীনও হতে হতো। বিশেষ করে মহিলাদের জন্য এই ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত কষ্টকর ও অস্বাস্থ্যকর।
বর্তমান প্রেক্ষাপট
আজকের দিনে প্রতিটি ট্রেন কোচেই টয়লেট থাকাটা বাধ্যতামূলক। সকল শ্রেণির যাত্রী, এমনকি কমিউটার ট্রেনেও টয়লেট পাওয়া যায়। বর্তমানে ভারতীয় রেলে বায়ো-টয়লেট, ভ্যাকুয়াম টয়লেটের মতো আধুনিক ব্যবস্থাও চালু হয়েছে, যা পরিবেশবান্ধব এবং পরিচ্ছন্ন।
একজন সাধারণ যাত্রীর অসাধারণ অবদান
অখিল চন্দ্র সেন হয়তো সে সময় একজন সাধারণ মানুষ ছিলেন, কিন্তু তাঁর এক সাহসী চিঠি ভারতীয় রেলের ইতিহাসে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছিল। তাঁর এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ আজ লক্ষ লক্ষ যাত্রীর যাত্রাকে আরামদায়ক ও সম্মানজনক করে তুলেছে। টয়লেট ছাড়া ট্রেন যাত্রা এখন অচিন্তনীয়, কিন্তু এই পরিবর্তন এসেছে একজন সচেতন বাঙ্গালী নাগরিকের সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে। অখিল চন্দ্র সেনের মতো মানুষেরাই প্রমাণ করেন, সঠিক সময়ে সঠিক কথা বললে সমাজ বদলানো যায়। তাঁর লেখা সেই ঐতিহাসিক চিঠি আজও মনে করিয়ে দেয়, নাগরিক সচেতনতা এবং দাবি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতীয় রেলওয়ে তার পরে আর কখনও পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।