পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : কালীক্ষেত্র কলকাতার উত্তর প্রান্তে অবস্থিত কুমারটুলি মূলত মৃৎশিল্পীদের বাসস্থান ও কর্মক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত। বিশেষত দুর্গাপুজোর আগে এই অঞ্চল পরিণত হয় এক শিল্পমেলায়।। যেখানে প্রতিটি গলিতে তৈরি হয় ছোট থেকে বড় বিভিন্ন আকারের মাটির দেবীমূর্তি। তবে এই শিল্পক্ষেত্র কুমারটুলিরই এক কোণে লুকিয়ে আছে আরও এক ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় মূল্যবান স্থান ঢাকেশ্বরী মন্দির। ১/৩এ কুমারটুলি স্ট্রিটে অবস্থিত এই প্রাচীন মন্দির নানা ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। বহিরঙ্গে সাদামাটা এই ছোট্ট মন্দিরটি শুধু একটি উপাসনাস্থলই নয়, এটি বয়ে বেড়ায় দেশভাগের বেদনা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ইতিহাসের অনন্য সাক্ষ্য।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের উৎপত্তি ও দেশভাগের প্রেক্ষাপট
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করলেও তার খেসারত দিতে হয়েছিল কোটি কোটি মানুষকে। ধর্মের ভিত্তিতে উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে সৃষ্টি হয় ভারত ও পাকিস্তান। তারই অংশ ছিল পূর্ব বঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম বঙ্গ (ভারতের অংশ)। বিভক্তির জেরে বাংলাজুড়ে শুরু হয় দাঙ্গা, হানাহানি, লুঠতরাজ ও ধর্মীয় নিপীড়ন। ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান তথা শক্তিপীঠ ঢাকেশ্বরী মন্দির, যেখানে দেবী দুর্গার এক প্রাচীন রূপ, কাত্যায়নী মূর্তি রূপে পূজিত হতেন। কিন্তু দেশভাগের পর অসহিষ্ণুতা ও সহিংস পরিস্থিতির কারণে সেই ৮০০ বছরের প্রাচীন দেবী মূর্তিকে নিরাপদে রাখতে বাধ্য হন মন্দিরের সেবায়েতগণ।
জানা যায়, ১৯৪৮ সালে এই ক্রান্তিকালে এক বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়—ঢাকার মূল মন্দির থেকে দেবী ঢাকেশ্বরীর আসল সোনার মূর্তিকে গোপনে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়। রাজেন্দ্র কিশোর তিওয়ারি, হরিহর চক্রবর্তী ও ব্রজেন্দ্র দুবে মিলে অত্যন্ত গোপনীয়তায় মূর্তিটিকে একটি সাধারণ স্যুটকেসে কাপড় ও খবরের কাগজে মুড়ে বিমানে করে নিয়ে চলে আসেন। বিমানে আসার পরে দেবী মূর্তিকে রাখা হয় কলকাতার এক ধনী ব্যবসায়ী দেবেন্দ্রনাথ চৌধুরীর বাড়িতে। চৌধুরী পরিবারের উদ্যোগেই পরে কুমোরটুলিতে নির্মিত হয় স্থায়ী ঢাকেশ্বরী মন্দির।
কুমোরটুলির ঢাকেশ্বরী মন্দিরের স্থাপত্য ও দেবী মূর্তি
১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত হন দেবী ঢাকেশ্বরী। মূর্তিটি প্রায় ১.৫ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট, সোনালি বর্ণের। মূর্তিটিতে দেবী ঢাকেশ্বরী দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী রূপী। তাঁর ডান ও বাম পাশে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের মূর্তি, পেছনে রুপার তৈরি চালচিত্র এবং দেবীর বাহন সিংহ। এই মূর্তি দেবী কাত্যায়নীর প্রতিরূপ হিসেবে পূজিত হন। মন্দিরে রাম ও হনুমানের দুইটি মাটির মূর্তিও আছে, যারা দেবীকে নমস্কার করছেন।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য ও ধর্মীয় গুরুত্ব
কলকাতার এই ঢাকেশ্বরী মন্দির শুধুমাত্র একটি পূজার স্থান নয়—এটি একটি ‘উদ্বাস্তু মন্দির’। মূর্তির সঙ্গে সঙ্গে এখানে স্থান পেয়েছে সেই লাখো উদ্বাস্তু হিন্দুদের স্মৃতি, যারা দেশভাগের বিভীষিকায় নিজের ভিটেমাটি হারিয়েছিলেন। এমনকী দেবী স্বয়ং সেই সময় নির্বিঘ্নে পুজো পাওয়ার আশায় নিজের পীঠস্থান ছেড়ে অন্যত্র আসতে বাধ্য হয়েছিলেন।
ঢাকার প্রাচীন ঢাকেশ্বরী মন্দির, যা অন্তত ৮০০ বছরের পুরনো বলে অনুমান করা হয়, সেটির সঙ্গে এই মন্দিরের এক ঐতিহাসিক যোগ রয়েছে। কথিত আছে, রাজা বল্লাল সেন ঢাকার লাঙ্গলবন্দ এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন এবং পরে সেই অঞ্চলে দেবী মূর্তির আবিষ্কার করে তার প্রতিষ্ঠা করেন। সেই প্রাচীন মূর্তি এবং তার পূজা ঐতিহ্য যুগ যুগ ধরে চলে আসছিল ঢাকায়। কিন্তু ১৯৪৭-৪৮ সালের দেশভাগ সেই ধারাবাহিকতায় এক অপ্রত্যাশিত ছেদ এনে দেয়।
বর্তমানে ঢাকেশ্বরী মন্দির
আজও কুমারটুলির এই মন্দিরে নিয়মিত পুজো অনুষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে দুর্গাপুজো ও নবরাত্রির সময়ে এখানে বহু ভক্তের সমাগম ঘটে। যদিও মন্দিরটি আকারে ছোট, তবে এর মাহাত্ম্য অসীম। ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে এই মন্দির কলকাতার হিন্দু সমাজের মধ্যে এক অনন্য স্থান অধিকার করে রয়েছে।
নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, কুমারটুলির ঢাকেশ্বরী মন্দির নিছকই একটি মন্দির নয়। এটি ইতিহাস, বিশ্বাস, ব্যথা ও বেঁচে থাকার প্রতীক। দেশভাগের মতো বৃহৎ মানবিক বিপর্যয়ের মাঝেও মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি এবং ঐতিহ্যকে ধরে রাখার জন্য এই মন্দির এক জীবন্ত নিদর্শন। দেবী ঢাকেশ্বরী কেবল ঢাকার নয়, তিনি এই বাংলার, এই শহরের, এই জাতির হৃদয়ের মূর্তি হয়ে উঠেছেন। তাঁর সেই নতুন আবাসস্থল—কুমারটুলির মন্দির—তাই ইতিহাসের পাতায় এক বিশেষ স্থান দাবি করে।