পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : কথায় বলে, ‘রতনে রতন চেনে’। আর এই কথাই একাধিক বার প্রমাণ করে দিয়েছিলেন অবতার বরিষ্ঠ ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব। সেই তিনি যখন প্রথম ছোট্ট সারদাকে দেখেছিলেন, এক বার দেখাতেই বুঝতে পেরেছিলেন যে, তিনিই ভবিষ্যতের জগৎজননী। আবার প্রথম দেখাতেই নরেন্দ্রনাথকে চিনতে পেরেছিলেন ঠাকুর। বলেছিলেন, “এত দেরি করে আসতে হয়?” তবে, একবার এমন এক আধ্যাত্মিক যোগসূত্রে দুই মহামানব একত্রিত হয়েছিলেন, যে দৃশ্য দেখে ঠিক মনে হয়েছিল, মন চল নিজ নিকেতনে, সংসার বিদেশে বিদেশির বেশে ভ্রম কেন অকারণে। কারণ, তাঁরা দুজনেই তখন ছিলেন এই মনুষ্য জগতের বাইরে। তাঁদের মন, তাঁদের আলোচনা, তাঁদের ভাব সবই অন্তর্মুখী, সকল মানুষের বোধগম্যের অতীত ছিল। কী যে কথা হয়েছিল তাঁদের, সেটা শুধু তাঁরাই জানতেন।
সাল ১৮৬৮। শ্রী শ্রী ঠাকুর লোকমাতা রানি রাসমণির ছোট জামাই মথুরবাবুর সাথে তীর্থ করতে কাশী গিয়েছেন। সঙ্গে ছিলেন ঠাকুরের ভাগ্নে হৃদয়রাম। এক শীতের সকালে কাশীর পবিত্র ধূলিমাখা পথে হেঁটে চলেছেন ঠাকুর আর মথুরবাবু। ইতোমধ্যে বাবা বিশ্বনাথকে দর্শন করা হয়ে গিয়েছে। এবার অন্তরে এক তীব্র আকর্ষণ, এক অদ্ভুত টান—তাঁর মনে প্রবল ইচ্ছা জন্মেছে। কাশীর সচল বিশ্বনাথ, পরমযোগী ত্রৈলঙ্গ স্বামীর দর্শন করবেন। এই সাধকের অলৌকিক কীর্তির কথা তিনি বহু শুনেছেন। তাই মথুরবাবুকে বললেন, ‘‘দেখো তো, কোথায় আছেন ত্রৈলঙ্গ স্বামী? আমি তাঁকে দর্শন করতে চাই।’’
মথুরবাবু হাসলেন, ‘‘ঠাকুর, চিন্তা কোরো না। আমি তাঁর খবর নিয়ে আপনাকে নিয়ে যাবো।’’ ঠাকুর শিশুর মতো হাসলেন—‘‘তাই হোক।’’
খবর এল—ত্রৈলঙ্গ স্বামী তখন কাশীর এক বিখ্যাত গৃহস্থ ভক্ত মঙ্গল ভট্টের বাড়িতে। তাঁর শিষ্যা শঙ্করী মাতাজিও সদ্য হিমালয় থেকে ফিরে গুহাকৃতি সাধনকক্ষে অবস্থান করছেন।
মঙ্গল ভট্টজির বাড়িতে পৌঁছে ঠাকুর প্রণাম করলেন ত্রৈলঙ্গ স্বামীকে। তখন ত্রৈলঙ্গ স্বামী গভীর ধ্যানস্থ। মুখে শব্দ নেই, চোখে এক অপরূপ দীপ্তি। শঙ্করী মাতাজি পরবর্তী সময়ে স্মরণ করেছেন, কী আশ্চর্য সেই মিলনমুহূর্ত— ৩২ বছরের শ্রী রামকৃষ্ণ ও ২৬১ বছর বয়সী ত্রৈলঙ্গ স্বামী একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছেন একদৃষ্টে।। ঠিক এক নবীন ও এক প্রবীণ মহাসাগর যেন পরস্পরের সীমানায় এসে মিশেছে।
ঠাকুর মৌন ইঙ্গিতে ত্রৈলঙ্গ স্বামীকে প্রশ্ন করলেন, ‘‘ভগবান এক না দুই?’’
ত্রৈলঙ্গ স্বামী শান্তভাবে উত্তর দিলেন—‘যখন সাধক আত্মার সাথে সম্পূর্ণ এক হয়ে যায়, তখন এক—অদ্বৈত। কিন্তু যখন ভক্ত ভগবানের অন্বেষণে থাকে, তখন দুই—ভক্ত ও ভগবান।’
ঠাকুরের মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তির ছাপ, চোখে জ্যোতি। তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, ‘‘ধর্ম কী?’’
উত্তর এল—‘‘সত্য।’’
‘‘জীবের কর্ম কী?’’
‘‘জীবসেবা।’’
‘‘প্রেম কী?’’
‘‘ভগবানের নাম স্মরণে যখন হৃদয় ভিজে ওঠে, চোখে জল আসে—সেই অবস্থা প্রেম।’’
এই কথাগুলি শঙ্করী মাতাজির নিজে কানে শুনেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, “এই কথা শুনে ঠাকুরের ভাবসমাধি হল। তাঁর দুই চোখ দিয়ে প্রেমাশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল—যেন চিবুক বেয়ে ঢলে পড়ছে গঙ্গাধারার মতো।”
ত্রৈলঙ্গ স্বামী ইঙ্গিতে মাতাজিকে বললেন—ঠাকুরের মাথায় পাখার বাতাস করতে। মাতাজি দ্বিধাহীন চিত্তে ঠাকুরের শিরে বাতাস করতে লাগলেন। তখন দুজন সাধকের চারপাশে যেন আলোর জ্যোতির্মন্ডল ছড়িয়ে পড়ল।
পরক্ষণেই ঠাকুরের ভাব সমাধি ভঙ্গ হলো। উঠে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে নাচতে লাগলেন। মথুরবাবু ও অন্যান্যরা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। পরে ঠাকুর বললেন, ‘‘মথুর, আধা মন ক্ষীর আনাও। আমি নিজে হাতে খাওয়াব আমার বিশ্বনাথকে।’’
বলা মাত্র মথুরবাবু খাঁটি ক্ষীর নিয়ে এলেন। ঠাকুর নিজের হাতে খাইয়ে দিলেন ত্রৈলঙ্গ স্বামীকে—যেন এক ভগবান আরেকজন ভগবানকে নিবেদন করছেন।
শঙ্করী মাতাজি পরে লিখেছেন, ‘‘উভয়ে তখন প্রেমানন্দসাগরে ভাসিতেছিলেন। তাঁদের মধ্যে যে ভাষায় কথা চলছিল, তা সাধারণ মানুষের বোধগম্যের অতীত। তাতে ছিল আত্মার ভাষা, নির্বাণের ভাষা।’’
শেষে দুজনের দৃষ্টি মিলল। চুপচাপ, অথচ গভীর বোধে পরিপূর্ণ। যেন এই নীরবতায় প্রকাশ পেল বিশ্বচৈতন্যের মহা সত্য।
এই অলৌকিক সাক্ষাৎ শুধু দুটি মহান সাধকের মিলন নয়, বরং মানবজীবনের শ্রেষ্ঠ সাধনার নিদর্শন—যেখানে ‘আমি’ আর ‘তুমি’ নেই, আছে শুধু এক পরম সত্তার অনন্ত প্রকাশ।
কাশীর আকাশ যেন সেদিন এ অনির্বচনীয় লীলা দেখে ভারী হয়ে উঠেছিল । সে লীলা ছিল হরি ও হরের। যুগ যুগ ধরে এই কাহিনি সাধু-সন্ন্যাসী, গৃহী-ভক্তদের মুখে মুখে ফিরতে থাকবে।
জয় শ্রী শ্রী ত্রৈলঙ্গ স্বামী, জয় শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব।