নিজস্ব প্রতিনিধি: বিরোধীরা তাঁর পতন দেখতে চায় হামেশাই। দলেরও একটা অংশ তাঁকে নিয়ে বেশ ইর্ষান্বিত। নেহাত মাথার ওপর দিদির হাত, তাই প্রকাশ্যে কেউ কিছু বলেন না। তিনি যে এসব কিছু জানেন না বা বোঝেন না, এমনটা কিন্তু মোটেও নয়। বরঞ্চ তাঁর তিহার বাস তাঁকে এই সব বিষয়ে আরও পরিপক্ক করে দিয়েছে। আর তাই এখন তিনি নিজে আর জেলায় দলের রাশ একনাগাড়ে নিজের হাতে ধরে রাখতে চান না। সময় থাকতে থাকতেই মাথা উঁচু করেও পদ ছেড়ে চলে যেতে চাইছেন। সেই ইঙ্গিতও এদিন অর্থাৎ সোমবার নিজ মুখেই দিয়ে দিলেন। সেটাও কোনও ঘরোয়া বৈঠকে নয়। প্রকাশ্যে দলেরই বিজয়া সম্মিলনীর মঞ্চ থেকে। খোদ দাদার মুখে এমন কথা শুনে এদিন অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। অনেককেই দেখা যায় চোখের জল মুছতে। কিন্তু তিনি নাছাড়বান্দা। ‘২৬’র পরে আর নয়। দিদিকে(Mamata Banerjee) আরেকবার মুখ্যমন্ত্রী করে দিই, তারপর আমার ছুটি।’ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। নজরে কেষ্ট, মানে বীরভূম(Birbhum) জেলা তৃণমূলের(TMC) সভাপতি অনুব্রত মণ্ডল(Anubrata Mondol)। নিজ মুখেই এদিন তিনি দিয়েছেন পদ ছাড়ার ইঙ্গিত।
আরও পড়ুন, GST জয়ের পরে পরেই ওষুধের দামবৃদ্ধি রুখতে মোদিকে চিঠি মমতার
সোমবার সিউড়ির ২ ব্লকের পুরন্দরপুরের মাঠে দলের বিজয়া সম্মিলনীর অনুষ্ঠান ছিল। এই ব্লকেরই তৃণমূলের সভাপতি নুরুল ইসলাম আবার তাঁর বন্ধু। দুজনে প্রায় একসঙ্গেই রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন। সেই নুরুল ইসলামও ব্লক সভাপতির পদ ছাড়তে চেয়ে চিঠি দিয়েছেন দলীয় শীর্ষ নেতৃত্বকে। এদিন তা নিয়ে মুখ খোলেন অনুব্রত। জানান, ‘বন্ধু নুরুল, ২০২৬ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চতুর্থবারের জন্য মুখ্যমন্ত্রী পদে বসিয়ে জেলা সভাপতি পদ থেকে আমি সরে দাঁড়াব। তখন তুমিও ব্লক সভাপতি পদ ছেড়ে দিও। নুরুল খুব ভাল ছেলে। আমরা একসঙ্গে রাজনীতিতে পথ চলা শুরু করেছি এবং একসঙ্গে কাজ করেছি। আমি নুরুলকে বলব, এখনই পদ-না ছাড়ার কথা। আর এক বার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুখ্যমন্ত্রী করে দেওয়ার পর ছাড়তে হলে, একসঙ্গে দাদা-ভাই মিলে পদ ছাড়ব।’ কেষ্ট’র মুখে এই কথা শোনা মাত্র সভায় হুলস্থূল ছড়িয়ে পড়ে। কেষ্ট অনুগামীদের অনেককেই হাউ হাউ করে কাঁদতে দেখা যায়। কেউ কেউ নীরবেই চোখের জল মোছেন। কিন্তু এগিয়ে গিয়ে কেউ সাহস পাননি, এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার কথা বলতে। কিন্তু হুট করে নিজের পদ ছাড়ার কথা কেন ঘোষণা করে দিলেন কেষ্ট? দল থেকেই কী তাঁকে পদ ছাড়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে? তিনি সরে গেলে সেই পদে কেই বা আসবে?
আরও পড়ুন, ভাইফোঁটার পরে পরেই বেসরকারি বাস ধর্মঘটের সম্ভাবনা, নেপথ্যে ভাড়া
কেষ্ট অনুগামীদের দাবি, অনুব্রত যতদিন দাপটের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন তখন তাঁর সামনে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে দাঁড়াতে পারেননি। তা সে দলের মধ্যেই হোক কী দলের বাইরে। সেই সময় সবাই ভেবেছিলেন অনুব্রতের দাপট দাঁড়িয়ে আছে মস্তানবাহিনীর ওপর। কিন্তু অনুব্রতের জেলযাত্রার পরে সেই মস্তানবাহিনীর টিকির দেখাও কেউ দেখতে পাননি। বিরোধীরাও বলতে পারেনি, তাঁদের ওপর কেউ কোনও অত্যাচার করেছে। বরঞ্চ অনুব্রতহীন জেলায় তৃণমূলের নেতা থেকে কর্মী মায় সমর্থকেরা বিরোধী দলগুলির অত্যাচারের শিকার হয়েছে। এই সময়েই দলে তৃণমূলের অনেক নেতাই অনুব্রত মণ্ডলের শূন্যস্থান পূরণ করতে উঠে পড়ে লাগে। এমন ঘটনা যে ঘটতে পারে সেটা অনুমান করেই সম্ভবত দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনুব্রত মণ্ডলকে দলের জেলা সভাপতি পদ থেকে সরাননি। দেখা গেল অনুব্রতের বিকল্প কেউ হয়ে উঠতে পারেননি তাঁর অবর্তমানেও। আর এখন তাঁরা দেখছেন, অনুব্রতের ক্যারিশ্মা দাঁড়িয়ে আছে আমজনতার কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা আর জনপ্রিয়তার ওপরে। তাই তাঁরা আর যাই হোক কোনওদিনই অনুব্রতের বিকল্প হয়ে উঠতে পারবেন না। এখন তাই নিজেদের ইচ্ছাপূরণ সম্ভব নয় জেনে তাঁরা অনুব্রতের পিছনে তাঁর সমালোচনা শুরু করে দিয়েছেন যা কেষ্ট’র কানে যেতে সময় লাগেনি। সেই কারণেই তিনি কিছুটা তিতিবিরক্ত হয়েই এদিন নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন।