পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : ভাবলেই অবাক লাগে যে, স্বয়ং জগৎপালকের বুকে পদচিহ্ন ! হ্যাঁ, এমনই দেখা যায় শ্রী শ্রী জগন্নাথ মূর্তিতেও, এমনকি লাড্ডু গোপালের বুকেও। কিন্তু কেন ? এই পদচিহ্ন কার ? এই বিষয়ে জানতে গেলে শ্রী বিষ্ণুর পাশাপাশি আরও তিন জনের প্রসঙ্গে বলতে হবে। কিন্তু এই তিনজন কে কে ? এই তিনজন হলেন ব্রহ্মা, মহেশ্বর ও মহর্ষি ভৃগু। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে বিষ্ণুর বুকের এই পদচিহ্ন মহর্ষি ভৃগুর, যিনি ছিলেন প্রাচীন প্রজাপতি ও সপ্তর্ষিদের অন্যতম এবং একাধারে ভার্গব বংশের প্রতিষ্ঠাতা। কথিত আছে, পুরাকালে একবার ব্রহ্মা বরুণ দেবের যজ্ঞ করেছিলেন। সেই যজ্ঞাগ্নি থেকেই জন্ম হয়েছিল মহর্ষি ভৃগুর।
জানা যায়, একদা ব্রহ্মা, শিব ও বিষ্ণু—এঁদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠ—মুনিঋষিরা এর মীমাংসার জন্য মহর্ষি ভৃগুকে দায়ভার দেন। সেই মত ভৃগু প্রথমে ব্রহ্মার কাছে যান এবং ব্রহ্মলোকে গিয়ে তিনি ইচ্ছা-পূর্বক ব্রহ্মাকে সম্মান করেন না। এতে ব্রহ্মা ক্রুদ্ধ হলে মহর্ষি তাঁকে সন্তুষ্ট করে শিবলোকে দেবাদিদেব মহাদেবের কাছে যান। সেখানেও শিবকে সম্মান না দেখানোর জন্য মহেশ্বর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে ভৃগুকে হত্যা করতে উদ্যত হন। তখন তিনি মহাদেবের স্তব করে তাঁকে সন্তুষ্ট করেন। এবার অবশিষ্ট শুধু বিষ্ণু। তিনি বৈকুন্ঠে অনন্ত শয্যায় শুয়ে ছিলেন। ভৃগু তখন গোলোকে গিয়ে বিষ্ণুকে নিদ্রিত দেখে বিষ্ণুর বক্ষস্থলে পদাঘাত করেন। তখন শ্রী বিষ্ণু জেগে উঠে ভৃগুর পা পদাঘাতে ব্যথিত হয়েছে মনে করে ভৃগুর পদসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। বিষ্ণু ক্রোধের বিন্দুমাত্র চিহ্ন না দেখিয়ে আরও বেশি নত ও বিনয়ী হয়ে ভৃত্যের মত ব্যবহার করলে মহর্ষি নিজেই লজ্জায় পড়ে যান ও ক্ষমাপ্রার্থী হন। এরপরই মহর্ষি ভৃগু স্থির করেন যে, বিষ্ণুই শ্রেষ্ঠ দেবতা এবং তাঁর পূজাই শ্রেষ্ঠ। সেই তখন থেকেই ভৃগুর পদচিহ্ন বিষ্ণুর বক্ষে চিহ্নিত আছে।
তবে ভৃগুর এমন হীন আচরণ দেখে ক্রোধে ফেটে পড়েছিলেন দেবী লক্ষ্মী। কেননা ভৃগু বিষ্ণুর যে স্থানে লাথি মেরেছিলেন, সেখানে দেবী লক্ষ্মীর বাস। তাই সেদিক থেকে তিনি প্রকৃতপক্ষে দেবীকেই লাথি মেরেছিলেন। এরপরই দেবী লক্ষ্মীর রোষের মুখে পড়েন ভৃগু। তাঁকে অভিশাপ দিয়ে বসেছিলেন দেবী লক্ষ্মী। দেবী লক্ষ্মী শুধু তাঁকে নয়, পুরো ব্রাহ্মন সমাজকে অভিশাপ দেন, কোন ব্রাহ্মণ লক্ষ্মীর কৃপা পাবে না। সমস্ত ব্রাহ্মণরা সর্বদা সম্পদহীন থাকবেন। তাঁদের দারিদ্রতাই সঙ্গী হবে। যদিও এরপরে ঋষি ভৃগু ক্ষমা চাইলে দেবী লক্ষ্মী তাঁকে বলেন, যদি কোন ব্রাহ্মণ নিষ্ঠা ভরে ভগবান বিষ্ণুর আরাধনা করেন, তবেই তিনি এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবেন ।