পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : হিন্দু সনাতন ধর্মে দশমহাবিদ্যার গুরুত্ব অপরিসীম। দশমহাবিদ্যা হল দেবী পার্বতীর সাকার দশটি বিশেষ রূপের সমষ্টিগত নাম। এই দশমহাবিদ্যারই অষ্টম মহাবিদ্যা হল দেবী বগলামুখী (Baglamukhi )। বগলামুখী মাতা সিদ্ধবিদ্যা ও পীতাম্বরাবিদ্যা ইত্যাদি নামে প্রসিদ্ধ। তিনি পীতবস্ত্রা, পীতপুস্পপ্রীয়া, এবং পীতঅলঙ্কারধারিনি। কথিত আছে, বগলামুখীর আরাধনা করলে শত্রুদের বিনাশ, জীবনে সাফল্য আসে। বগলামুখীর মন্ত্র সাধকের সমস্ত ইচ্ছা পূরণ করে। বগলামুখী মন্ত্র সমস্ত ধরণের বাধা থেকে মুক্তি দেয়, রোগ এবং দুর্ঘটনার দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা থেকে রক্ষা করে এবং সুরক্ষা দেয়। কথিত আছে যে বগলামুখী মন্ত্রের নিয়মিত জপ অহং বিনাশ করে এবং শত্রুদের বিনাশ করে। মায়ের সাকার রূপে দেখা যায়, তিনি তাঁর বাম হস্তে একটি অসুরের জিভ টেনে ধরে রয়েছেন ও তাঁর দক্ষিণ হস্তে রয়েছে একটি মুদ্গর। তিনি বসে রয়েছেন একটি শবের উপর।
তবে, এই ক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগতে পারে, যে বগলার হাতে মুদ্গর কেন ? কেনই বা তিনি শত্রুর জিহ্বা টেনে ধরেছেন? এবং তিনি কেন একটি মৃতদেহের উপর বসে রয়েছেন? দেবীর হাতের মুদ্গর থাকার অর্থ “মোহমুদ্গার” অর্থাৎ মোহ ধ্বংসকারী। মুদ অর্থে বিষয় সুখ, যা হল বিষতুল্য। আর গর মানে গরল বা বিষ অর্থাৎ বিষয় আশায়। তাই বলা যেতে পারে মনুষ্যের মোহকে ধ্বংস করার জন্য দেবীর হাতে মুদ্গরের উপস্থিতি । শাস্ত্র মতে মোহের চেয়ে পাপ আর কিছুই নেই। আর এই মোহবশেই সকল জীব আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। মা বগলা এই সর্বনাশা মোহ থেকে জীবকে নিষ্কৃতি দেন বলেই তাঁর দক্ষিণহস্তে মুদ্গর। মোহগর্তে পতিত মানুষ যদি বগলা মাকে স্মরণ করে, তাহলে মা তাকে উদ্ধার করেন। আর মানুষ যাতে কখনও মোহপাশে আবদ্ধ না হয় সেজন্য দেবী মনুষ্যকে মুদ্গার দিয়ে শাসন করেন।
অপর দিকে দেবী বাম হাতে অসুরের জিভ ধরে থাকেন কারণ, জিভ লোভ লালসা বাড়ায়, তেমনি অকথ্য ভাষণেও তৎপর হয়ে থাকে। জিহ্বা মানুষকে নিরয়গামী করে। বিষয়ী লোকের জিহ্বা ব্যাঙের জিহ্বার মত । কারণ, ব্যাঙ নিজ সুখের জন্য জিভ দিয়ে একরকম শব্দ করে. যার জন্য সাপ সেই সূত্র ধরে তাকে খুঁজে বের করে। তেমনি লোভী বিষয়ী মানুষ অনবরত বিষয় কথা বলে সংসার জ্বালায় জ্বলে মরে। এর মূল কারণ জিভ। জিভকে সংযত করা আগে দরকার। এই জিহ্বা বাক্তম্ভনের প্রতীক। জিহ্বা সংযত করলেই লোভ দূর হয়। তাই বগলা মা অতিভোজন, অতিভাষণ ও পরচর্চা থেকে বিরত থাকার জন্য শত্রুর জিহ্বা ধরে তারই ইঙ্গিত দিচ্ছেন।
এছাড়া তাঁর নিচে অবস্থিত শব হল মনুষ্য দেহের প্রতীক। কারণ তিনিই হলেন দেহের অধিষ্টাত্রী। তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন মনুষ্য দেহকে। হিন্দু শাস্ত্র মতে দেবী বগলামুখী হলেন মঙ্গলগ্রহের ইষ্টদেবী এবং দশমহাবিদ্যার শক্তিশালী এবং সহায়ক শক্তি ৷ বগলা দেবী একাধারে অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের প্রতিনিধিত্ব করেন। প্রতিদিন ১০৮ বার বগলামুখী বীজ মন্ত্র জপ করলে শত্রু নাশ, মামলায় জয়লাভ, মঙ্গলের কুপ্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
“ওঁ হ্লীং বগলামুখী সর্ব দুষ্টানাং বাচং মুখং পদং স্তম্ভন, জিহ্বাং কীলয় কীলয় বুদ্ধি বিনাশায় হ্লীং ওঁ স্বাহা ।।”