পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : দেবী আদ্যাশক্তি, তিনিই ভগবতী সতী, তিনিই মহামায়া। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, পরমাপ্রকৃতি আদ্যাশক্তি পার্বতীরই সাকার দশটি বিশেষ রূপের সমষ্টিগত নাম হল দশমহাবিদ্যা। হিন্দু সনাতন ধর্মে এই দশমহাবিদ্যার গুরুত্ব অপরিসীম। দেবীত্বের এই ক্রমবিকাশে একদিকে যেমন রয়েছে ভয়ঙ্করী দেবীমূর্তি, তেমনই আবার অন্য প্রান্তে রয়েছে মোক্ষ ও অভয়দায়িনী অপরূপা সুন্দরী দেবীমূর্তি । জানা যায়, দেবীর এই দশটি মহাবিদ্যার মধ্যে ষষ্ঠ মহাবিদ্যা হলেন দেবী ছিন্নমস্তা (Chhinnamasta)।
দশমহাবিদ্যামধ্যস্থিত দেবী ছিন্নমস্তার সাকার রূপটি আপাতদৃষ্টিতে যথেষ্ট ভয়ঙ্কর। দেখা যায়, দেবী নিজের মাথা নিজে কেটে নিজেই রক্তপান করছেন। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন দুই সহচরী। আবার দেবীর পায়ের নিচে রয়েছেন সঙ্গমরত শায়িত নারী পুরুষের যুগল মূর্তি। তাই প্রশ্ন আসতেই পারে, এই ছিন্নমস্তা দেবী কে ? কেনই বা তাঁর মূর্তি এমন ভয়ঙ্কর ? কারণ, এই দেবী ছিন্নমস্তা আত্মবলিদান ও কুণ্ডলিনী শক্তির জাগরণের প্রতীক। অন্যদিকে তিনি একাধারে যৌনশক্তি ও যৌনসংযমের প্রতীক। তন্ত্রে-পুরাণে দেবী ছিন্নমস্তার আবির্ভাবকে ঘিরে বেশ অনেকগুলি উপকথা দানা বেঁধেছে। এই উপকথাগুলির মধ্যে যেটি সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য, তা তুলে ধরা হল।
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, একদা শিব ও চণ্ডিকা (পার্বতী) রতিসংগমে রত ছিলেন। চণ্ডিকা ছিলেন বিপরীত রতিতে। এমতাবস্থায় শিবের বীর্যস্খলন হলে চণ্ডিকা ক্রুদ্ধ হন। ক্রোধবশে তাঁর দেহ থেকে ডাকিনী ও বর্ণনী নামে দুই সহচরীর জন্ম হয়। জানা যায়, দেবীর এই দুই সহচরী ডাকিনী ও বর্ণনীই জয়া ও বিজয়া নামে পরিচিত। নারদ পঞ্চরাত্র গ্রন্থের বর্ণনানুসারে, পার্বতী তাঁর দুই সহচরী ডাকিনী-বর্ণিনীকে নিয়ে মন্দাকিনীতে স্নান করতে গিয়েছিলেন। মন্দাকিনীর সুশীতল জলে স্নান করে পার্বতী অত্যন্ত সুখী ও কামাতুরা হয়েছিলেন। এরপর দেবীর গাত্রবর্ণ ধীরে ধীরে কৃষ্ণবর্ণ হয়ে গিয়েছিল। দেবীকে বিহ্বল হয়ে পদচারণা করতে করতে গৃহে ফেরাকালীন পথে হঠাৎ ডাকিনী ও বর্ণিনী তাঁকে বললেন–হে মহেশ্বরী, আমাদের অত্যন্ত ক্ষিদে পেয়েছে। আপনি এই মূহূর্তে আমাদের কিছু ভক্ষ্য দ্রব্য দান করুন। মহেশ্বরী দেবী পার্বতী তাঁদের কথা শুনে বললেন—তোমরা ক্ষণকাল অপেক্ষা কর। আমি তোমাদের ভক্ষ্যপ্রদান করব। এই বলে তাঁরা আবার পথ অতিক্রম করতে লাগলেন।
এরপর ডাকিনী ও বর্ণিনী পুনরায় পার্বতীকে খেতে দেওয়ার জন্য বলতে থাকলে নিজের সখীদের বিনীত আবেদন শুনে অপার করুণাময়ী দেবী নিজের খড়্গ দিয়ে নিজেরই মুণ্ডু কেটে ফেললেন । কাটা মুণ্ডটি দেবীর বাম হাতে এসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে সেই ছিন্ন স্থান থেকে তিনটি ধারায় রক্ত নির্গত হতে লাগল। দুই ধারা দুই সখীর মুখে খাদ্য হিসাবে পড়তে লাগল। অপর ধারাটি দেবীর বামহস্তে ধরা তারই ছিন্নমুণ্ডের মুখগহ্বরে এসে পড়ল। দেবী ছিন্নমুণ্ডিত হয়ে নিজের রক্ত নিজেই পান করতে লাগলেন। যেহেতু দেবী নিজমুণ্ড ছিন্ন করেছিলেন, তাই তাঁর ছিন্নমুণ্ড অবস্থার রূপ ছিন্নমস্তা নামে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। দেবী ছিন্নমস্তা নিজ রক্ত নিজে পান করলেও সেই রক্ত তাঁর পেটে যায় না। এক্ষেত্রে পেটে বা উদরে রক্ত যাওয়ার কোনও সার্থকতা নাই, কেননা রক্তধারা – বিশেষ করে সুষুম্নায় (মধ্যস্থানে) প্রবাহিত রক্তধারা কামকলাকুণ্ডলিনীর জাগৃতি ও গতি, সুতরাং তা ঊর্ধ্বগামী অমৃতধারা। ওই কামকলাকুণ্ডলিনী মূলাধার থেকে উঠে আবার যদি উদরে যায় তবে মূলাধারে তার ফিরে আসার ফলে জন্মমৃত্যুচক্রের অবসান হয় না। তাই রক্তধারা তথা কামকলাশক্তি বিশুদ্ধ চক্রভেদ করে ক্রমে আজ্ঞাচক্রে ও পরে আজ্ঞাচক্র ভেদ করে সহস্রারে পরমশিবের সঙ্গে মিলিত হয় ।
কথিত আছে, শত্রুবিজয়, রাজ্যপ্রাপ্তি, মোক্ষলাভের জন্য ছিন্নমস্তার পূজা একান্ত প্রয়োজনীয়। ছিন্নমস্তা নিজেকে কেটে ফেলেও জীবিত থাকেন। এটি নিজেতেই অন্তর্মুখী সাধনার পরিচয় প্রদান করে। দেবীর দুই সখী তমোগুণ ও রজোগুণের প্রতীক। পদ্মফুল হচ্ছে বিশ্বপ্রপঞ্চ আর কামরতি হল চিদানন্দের স্থূলবৃত্তি। জানা যায়, মাঝ রাতে কোনো সাধক দেবী ছিন্নমস্তার সাধনা করলে তাঁর সরস্বতী লাভ ঘটে। এছাড়া ছিন্নমস্তা দেবী মুক্তিকামী শক্তিসাধকদের কাছে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। দেবীর কৃপায় পুত্রহীনের পুত্রলাভ ও নির্ধনের ধনলাভ ঘটে এনং দেবীর ভক্তরা পাণ্ডিত্য লাভ করে থাকেন।
ছিন্নমস্তা ধ্যান :
এনাংকাশুপরেশভাল ফলকাং বালার্ককোট প্রভাং,
জ্বালাবদ্ধমহার্ঘরত্ননিচয়াং কন্দপর্দপোজ্জ্বলাম্।
শূলাক্ষাং কুশপাশবেণুমুষলাংভোজাভয়ান,
বিভ্রতীং ভক্তেষ্টাং ছিন্নমস্তকাং ভগবতী
ধ্যায়েদ হৃদব্জে সদা।।
প্রণাম মন্ত্র :
ওঁ হ্লীং শ্রীং ছ্রীং ছিন্নমস্তকে ফট্ স্বাহা। ওঁ শ্রীং হ্লীং হ্লীং ঐং বজ্রবৈরোচনীয়ৈ হ্লীং হ্লীং ফট্ স্বাহা।”