পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায়: দেবাদিদেব মহাদেব অপার করুণাময়। তিনি ভক্তের ভগবান। বারে বারে তিনি বিভিন্ন ভাবে তাঁর ভক্তদের রক্ষা করে এসেছেন। এমনকি তিনি ভক্তদের বিভিন্ন মৃত্যুযোগ, সর্পযোগ থেকেও রক্ষা করেন। এমনই এক মন্দির হল নাগেশ্বর, যা রয়েছে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের মধ্যে দশম স্থানে। এই জ্যোতির্লিঙ্গ গুজরাতের জামনগরে অবস্থিত। কথিত আছে, রুদ্র সংহিতায় মহাদেবকে ‘দারুকবনা নাগেশম’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। নাগেশ্বর অর্থাত্ সাপের দেবতা। নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ গুজরাতের দ্বারকা ধাম থেকে মাত্র ১৭ কিমি দূরে অবস্থিত।
কথিত আছে, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণও নাকি নাগেশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতেন। জানা যায়, এখানকার লিঙ্গটি দক্ষিণমুখী। ভক্তদের দাবি, এই লিঙ্গটি দ্বারকা শিলায় তৈরি। খুব নিখুঁত ভাবে দেখলে দেখা যায়, এই লিঙ্গের শীর্ষে ছোট ছোট চক্র রয়েছে। যা দেখতে অনেকটা ত্রিমুখী রুদ্রাক্ষের মত। শিবপুরাণ অনুযায়ী, বর্তমানে নাগেশ্বর মন্দির যেখানে, সেই জায়গায় সর্পকুলের রাজা দারুক রাক্ষস রাজত্ব করতেন। তাঁর স্ত্রী দারুকী ছিল দেবী পার্বতীর খুব বড় ভক্ত। দারুকীর ওপর সন্তুষ্ট হয়ে মাতা পার্বতী আশীর্বাদ করেছিলেন, দারুকী যেখান দিয়ে যাবে, দারুকবনও সেই স্থানে চলে যাবে। পরবর্তী সময়ে দেবতারা দারুকের অত্যাচার বন্ধ করতে তার রাজ্য আক্রমণ করলে সেই সময় সর্পরাজ দারুকের কথামতো তাঁর স্ত্রী মাতা পার্বতীর দেওয়া বরদান প্রয়োগ করেন। যার ফলে দারুকী সাগরতট দিয়ে পালায়। আর দারুকবনও সেই জায়গায় চলে যায়। দারুকবনের সাহায্যে নিরাপদে পালানোর পর ফের অত্যাচার শুরু করে দারুক। পুরাণ মতে, শিবের অনন্য ভক্ত ছিলেন সুপ্রিয় নামক এক ব্যবসায়ী। সুপ্রিয় ধর্মাত্মা ও সদাচারী ছিলেন। কথিত আছে, একবার সমুদ্র পথে কোথাও যাচ্ছিলেন সুপ্রিয়। তখনই দারুক তাঁর ওপর আক্রমণ করে দেয়। এমনকী, সুপ্রিয় ও তার সহচরদেরও বন্দি করেন দারুক। এমন সময় সুপ্রিয় মহাদেবের তপস্যা করলে মহাদেব দারুককে বিনাশ করার জন্য তাঁকে পাশুপাত অস্ত্রদান করেন। যথা সময়ে দারুক রাক্ষসকে বধ করলেন সুপ্রিয়। ভক্তের মনস্কামনা পূরণ করার অভিপ্রায়ে মহাদেব সেখানে নিজের জ্যোতি দিয়ে জ্যোতির্লিঙ্গ সৃষ্টি করেন। সেই লিঙ্গকেই নাগেশ্বর বা নাগদের দেবতা রূপে পুজো করা হয়। দেবী পার্বতী এখানে পূজিতা হন নাগেশ্বরী রূপে।
এছাড়াও, ইতিহাসের পাতা উল্টালে জানতে পার যায়, মোঘল সম্রাট অওরঙ্গজেব নাগেশ্বর শিবলিঙ্গ ধ্বংসের জন্য আক্রমণ করেছিলেন। সেই সময় কোথা থেকে হাজার হাজার মৌমাছি তাঁকে ও তাঁর সেনাদের আক্রমণ করেছিল। যার জেরে শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী নিয়ে পালাতে হয়েছিল মোঘল সম্রাটকে। কথিত রয়েছে, নাগেশ্বর মন্দিরের আশপাশে আরও কয়েকটি মন্দির রয়েছে। যেমন রুক্মিনী মন্দির, গায়ত্রী মন্দির, গীতা মন্দির, ব্রহ্ম কুণ্ড, হনুমান মন্দির, ইত্যাদি। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী মনে করা হয়, জন্মকুণ্ডলীতে সর্পদোষ থাকলে বাবা নাগেশ্বরের কাছে ধাতুর তৈরি সাপ নিবেদন করলে সর্পদোষ থেকে অবিলম্বে মুক্তি পাওয়া যায়। নাগেশ্বর মন্দিরে বসে শ্রদ্ধাসহ বাবার মাহাত্ম্য কাহিনি শুনলে ও নাগেশ্বরের দর্শন করলে সেই ব্যক্তির সকল পাপের অবসান হয়। উল্লেখ্য, নাগেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গের গর্ভগৃহে শুধু মাত্র পুরুষরাই ধুতি পরে প্রবেশ করতে পারেন। মহাশিবরাত্রি এবং শ্রাবণ মাসে দূর-দূরান্ত থেকে অগণিত ভক্তরা আসেন এই নাগেশ্বর মন্দিরে ।