নিজস্ব প্রতিনিধি, ঢাকা: ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বের করা যাবে না বলে বুধবারই হুঙ্কার ছেড়েছিলেন মুসলিম জঙ্গি সংগঠন ইসলামী আন্দোলনের সিনিয়র নায়েবে আমীর ফয়জুল করিম। আর সেই হুঙ্কারের কয়েক ঘন্টার মধ্যেই দেশের সব মাদ্রাসায় চৈত্র সংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষ উদযাপনের নির্দেশ দিল শিক্ষা মন্ত্রক। আর ওই বিজ্ঞপ্তি নিয়েই ক্ষোভে ফুঁসে উঠছেন মৌলবাদী আর কট্টর মুসলিমরা। সরকারের ওই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে সুর চড়িয়েছেন তাঁরা। হিন্দুদের উৎসব পালন বন্ধ না করলে রাজপথে নেমে তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলেও হুঙ্কার ছেড়েছেন তাঁরা।
গতকাল বুধবার (৯ এপ্রিল) মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদফতরের তরফে এক নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ‘চৈত্র সংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষ এবং আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নববর্ষ উপলক্ষে সব মাদ্রাসায় নিজস্ব ব্যবস্থাপনা উৎসবমুখর পরিবেশে ও সাড়ম্বরে উৎসব পালন করতে হবে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হবে।দুদিনের অনুষ্ঠান যাতে উৎসব মুখর হয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’ গত ২৩ মার্চ সংস্কৃতি মন্ত্রকের এক বৈঠকে দেশের সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
ইতিমধ্যেই নববর্ষের দিন রাজধানী ঢাকায় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বের করা যাবে না বলে হুঙ্কার ছাড়ল দেশের অনতম মুসলিম জঙ্গি সংগঠন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। সংগঠনের সিনিয়র নায়েবে আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ ফয়জুল করীম হুঙ্কার ছেড়ে বলেছেন, ‘পয়লা বৈশাখের দিন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে কোনও মিছিল বের করা যাবে না। বাংলা নববর্ষ উদ্যাপনের কোনও আয়োজনে হিন্দুত্বের গন্ধ রয়েছে এমন কোনও কিছু করা যাবে না। কোনও সংগঠন বা ব্যক্তি যদি ইসলাম অসমর্থিত কিছু আয়োজন করেন, তাহলে করুণ পরিণতির জন্য তৈরি থাকবেন।’
১৯৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে নববর্ষের দিন সকালে প্রথমবারের মতো ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বের হয়েছিল। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সঙ্গী করে সব বর্ণ আর ধর্মের মানুষকে নিয়ে ওই রঙিন শোভাযাত্রার আযোজন করা হয়েছিল। প্রথম বছরেই দেশ তো বটেই গোটা বিশ্বের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছিল ওই শোভাযাত্রা। পরে ১৯৯০ সালে ওই শোভাযাত্রার নাম বদলে করা হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। গত ৩৯ বছর ধরেই পয়লা বৈশাখের সকালে ওই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন পথ পরিক্রমা করে আসছে। আর তাতে সামিল হতেন আট থেকে আশি-সব বয়সীরা। ওই শোভাযাত্রা ঘিরে উন্মাদনা ছিল চোখে পড়ার মতো। ইউনেস্কোর তরফ থেকেও ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের’ স্বীকৃতি পেয়েছিল।
যদিও কেন হিন্দুদের উৎসব নববর্ষের দিন ওই শোভাযাত্রা বের করা হচ্ছে তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আপত্তি জানিয়ে এসেছে জামায়াত ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম সহ কট্টর মৌলবাদী সংগঠনগুলি। বেশ কয়েকবার শোভাযাত্রার উপরে হামলাও চালানো হয়েছিল। যদিও খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে শেখ হাসিনা ওই শোভাযাত্রাকে উৎসাহ দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু গত ৫ অগস্ট রাজনৈতিক পালাবদলের পরেই দেশে ফের নখদাঁত বের করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে পাকিস্তান পন্থী মৌলবাদীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে আসীন হয়েছেন ‘রগকাটা সংগঠন’ হিসাবে কুখ্যাত ইসলামী ছাত্র শিবিরের শীর্ষ নেতা ও নব্বইয়ের দশকের হিন্দু নিধন যজ্ঞের হোতা নিয়াজ আহমেদ খান। সংস্কৃতি মন্ত্রকের বৈঠকে তিনিই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নাম নিয়ে আপত্তি জানান। তার ওই কথা লুফে নেন আর এক পাকিস্তানি দালাল তথা কট্টর হিন্দু বিদ্বেষী মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী। তিনি জানিয়ে দেন, ‘হিন্দুত্বের গন্ধ থাকা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম বদলাতে হবে।’
যদিও এই সিদ্ধান্তের কথা জানাজানি হতেই ক্ষোভ উগরে দিযেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সিংহভাগ পড়ুয়া। তারা পাল্টা হুঙ্কার ছাড়েন ‘রীতি মেনেই পয়লা বৈশাখের দিন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হবে।’ এদিন পড়ুয়াদের পরোক্ষে হুমকি দিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীর ফয়জুল করীম বলেন, ‘নববর্ষের দিন মানুষ শালীনতা ও ইতিহাস-ঐতিহ্য সমর্থিত পন্থায় নানা আয়োজন করতেই পারে। কিন্তু সেই দিন কোনও যাত্রা করলে তাতে মঙ্গল হবে—এমন বিশ্বাস করলে বা ধারণা করলে, পরিষ্কারভাবে তা পাপের দিকে নিয়ে যাবে। তাই মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে কোনও কিছু অবশ্যই করা যাবে না। ‘মঙ্গল’ শব্দ ও ধারণা অবশ্যই বাদ দিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নববর্ষের আয়োজন থেকে মঙ্গল শব্দ ও ধারণা বাদ দিতে বলা হচ্ছে। নববর্ষের আয়োজনে মূর্তিসহ ইসলাম অসমর্থিত সবকিছু বাদ দিন। বরং এ দেশের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বিবেচনা করে ইসলাম সমর্থিত ধারণা ও উপকরণ ব্যবহার করুন।’