নিজস্ব প্রতিনিধি, ঢাকা: আগামী পয়লা বৈশাখ নববর্ষের দিন রাজধানী ঢাকায় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বের করা যাবে না বলে হুঙ্কার ছেড়েছিল অনতম মুসলিম জঙ্গি সংগঠন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও হেফাজতে ইসলামী। আর ওই হুমকির কাছে হাঁটু গেড়ে আত্মসমর্পণ করল ‘পাকিস্তানি দালাল’ ও হিন্দু নিধন যজ্ঞের মদতদাতা মোল্লা মুহাম্মদ ইউনূস। বদলে গেল পয়লা বৈশাখের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে বের হওয়া ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম। আগামী পয়লা বৈশাখ যে বর্ণময় র্যালি বের হওয়ার কথা তার নাম হচ্ছে, ‘বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা’। আজ শুক্রবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে এ কথা জানিয়েছেন জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীর সাংস্কৃতিক সম্পাদক তথা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন আজহারুল ইসলাম।
১৯৮৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে নববর্ষের দিন সকালে প্রথমবারের মতো ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ বের হয়েছিল। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সঙ্গী করে সব বর্ণ আর ধর্মের মানুষকে নিয়ে ওই রঙিন শোভাযাত্রার আযোজন করা হয়েছিল। প্রথম বছরেই দেশ তো বটেই গোটা বিশ্বের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছিল ওই শোভাযাত্রা। পরে ১৯৯০ সালে ওই শোভাযাত্রার নাম বদলে করা হয় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। গত ৩৯ বছর ধরেই পয়লা বৈশাখের সকালে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে শুরু হত মঙ্গল শোভাযাত্রা। নানা সাজে বিভিন্ন বয়সী মানুষ অংশ নিতেন শোভাযাত্রায়। ঢাকের তালে তালে শাহবাগ মোড় হয়ে শিশুপার্কের সামনে দিয়ে ঘুরে ফের শাহবাগ হয়ে টিএসসিতে গিয়ে শেষ হত এটি। ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতিও পায় ‘মঙ্গগল শোভাযাত্রা’।
যদিও কেন হিন্দুদের উৎসব নববর্ষের দিন ওই শোভাযাত্রা বের করা হচ্ছে তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আপত্তি জানিয়ে এসেছে জামায়াত ইসলামী, হেফাজতে ইসলাম সহ কট্টর মৌলবাদী সংগঠনগুলি। বেশ কয়েকবার শোভাযাত্রার উপরে হামলাও চালানো হয়েছিল। যদিও খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে শেখ হাসিনা ওই শোভাযাত্রাকে উৎসাহ দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু গত ৫ অগস্ট রাজনৈতিক পালাবদলের পরেই দেশে ফের নখদাঁত বের করে ঝাঁপিয়ে পড়েছে পাকিস্তান পন্থী মৌলবাদীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে আসীন হয়েছেন ‘রগকাটা সংগঠন’ হিসাবে কুখ্যাত ইসলামী ছাত্র শিবিরের শীর্ষ নেতা ও নব্বইয়ের দশকের হিন্দু নিধন যজ্ঞের হোতা নিয়াজ আহমেদ খান। সংস্কৃতি মন্ত্রকের বৈঠকে তিনিই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নাম নিয়ে আপত্তি জানান। তার ওই কথা লুফে নেন আর এক পাকিস্তানি দালাল তথা কট্টর হিন্দু বিদ্বেষী মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী। তিনি জানিয়ে দেন, ‘হিন্দুত্বের গন্ধ থাকা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র নাম বদলাতে হবে।’
যদিও এই সিদ্ধান্তের কথা জানাজানি হতেই ক্ষোভ উগরে দিযেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের সিংহভাগ পড়ুয়া। তারা পাল্টা হুঙ্কার ছাড়েন ‘রীতি মেনেই পয়লা বৈশাখের দিন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হবে।’ হিন্দুত্বের গন্ধ থাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা যাবে না বলে গত বুধবারই হুমকি দিয়েছিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীর ফয়জুল করীম। তিনি বলেন, ‘নববর্ষের দিন মানুষ শালীনতা ও ইতিহাস-ঐতিহ্য সমর্থিত পন্থায় নানা আয়োজন করতেই পারে। কিন্তু সেই দিন কোনও যাত্রা করলে তাতে মঙ্গল হবে—এমন বিশ্বাস করলে বা ধারণা করলে, পরিষ্কারভাবে তা পাপের দিকে নিয়ে যাবে। তাই মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে কোনও কিছু অবশ্যই করা যাবে না। ‘মঙ্গল’ শব্দ ও ধারণা অবশ্যই বাদ দিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নববর্ষের আয়োজন থেকে মঙ্গল শব্দ ও ধারণা বাদ দিতে বলা হচ্ছে। নববর্ষের আয়োজনে মূর্তিসহ ইসলাম অসমর্থিত সবকিছু বাদ দিন। বরং এ দেশের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বিবেচনা করে ইসলাম সমর্থিত ধারণা ও উপকরণ ব্যবহার করুন।’