পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : ভারতীয় হিন্দু সনাতন ধর্মে পৌরাণিক ধর্মগ্রন্থগুলির মধ্যে অন্যতম মহাকাব্য হল মহাভারত। যার উপজীব্য বিষয় হল কৌরব ও পাণ্ডবদের গৃহবিবাদ এবং কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পূর্বাপর ঘটনাবলি। এই বিরাট মহাকাব্যেই এমন বহু ঘটনা আছে, যা আজও অনেকেরই জানার বাইরে। জানা যায়, যুধিষ্ঠির পাশা খেলায় পরাজিত হওয়ার পর পাঁচ পাণ্ডব ও তাঁদের স্ত্রী দ্রৌপদীকে কৌরবরা ১২ বছরের জন্য রাজ্যচ্যুত করে বনবাসে পাঠায়। এই সময় জগদ্গুরু সর্বজ্ঞানী শ্রীকৃষ্ণ বুঝতে পারেন যে কৌরবরা কখনই পাণ্ডবদের রাজ্য ফেরত দেবে না, এবং অবশ্যম্ভাবীভাবে একটি যুদ্ধ আসন্ন। তাই তিনি অর্জুনকে কৈলাসে গিয়ে মহাদেবের উপাসনা করে দেবাস্ত্র অর্জন করার নির্দেশ দেন। অর্জুন সেই নির্দেশ মেনে কৈলাসে রওনা দেন, আর অন্য চার ভাই ও দ্রৌপদী বনে বনে ঘুরে বেড়াতে থাকেন।
এইভাবে ভ্রমণ করতে করতে তাঁরা হিমালয়ের বদ্রিক আশ্রমে পৌঁছায়। আশ্রমের অপরূপ সৌন্দর্য বর্ণনার অতীত ছিল। একদিন, দ্রৌপদী প্রকৃতির শোভা উপভোগ করছিলেন, তখন হঠাৎ এক প্রবল বাতাস এসে সহস্র পাপড়ি বিশিষ্ট এক স্বর্গীয় পদ্মফুল এসে তাঁর কোলের ওপর পড়ে। এর মনোমুগ্ধকর সৌরভ ও অদ্ভুত সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি ভীমকে সেই ফুল দেখান এবং আরও এমন কিছু ফুল আনার অনুরোধ জানান। দ্রৌপদীকে খুশি করতে আগ্রহী ভীম সেই সুগন্ধ অনুসরণ করে গভীর বনে প্রবেশ করেন।
অনেক দূর চলার পর, ভীম তাঁর শঙ্খ বাজালে চারিদিক প্রতিধ্বনিত হয় এবং সিংহদের গর্জন শোনা যায়। হঠাৎ, এক প্রচণ্ড শব্দে পৃথিবী কেঁপে ওঠে। শব্দের উৎস খুঁজতে গিয়ে ভীম বানরকে দেখতে পান, যে এক শিলার ওপর শুয়ে ছিল এবং তার লেজ নাড়িয়ে সেই প্রচণ্ড শব্দ সৃষ্টি করছিল। ভীম সেই বানরের সামনে গেলে সে চোখ খুলে বলেন, “তুমি কেন এত শব্দ করছ? এই অরণ্যের প্রাণীরা শান্তিতে বিশ্রাম নিচ্ছিল, আর তুমি তাদের বিরক্ত করছ। সামনে যাওয়ার পথ দুর্গম ও স্বর্গের দিকে নিয়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের জন্য নয়। বরং বিশ্রাম নাও, ফল খাও, আর ফিরে যাও।” বানরের কথা শুনে ভীম বিস্মিত হন। তিনি নিজেকে পবনের পুত্র ও পাণ্ডবদের একজন হিসাবে পরিচয় দেন। বানরটি তখন বলে, “আমি অসুস্থ ও বৃদ্ধ, নড়তে পারছি না। তুমি চাইলে আমার লেজ সরিয়ে তোমার পথ পরিষ্কার করতে পারো।”
অতঃপর ভীম অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে এক হাতে লেজ সরানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তা বিন্দুমাত্রও সরাতে পারলেন না, এমনকী দুই হাতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। বারবার চেষ্টা করেও সফল হতে না পেরে তিনি ক্লান্ত হয়ে যান। এবার ভীম সবিনয়ে বলেন, “আপনি নিশ্চয়ই কোনো দেবতা। দয়া করে আমাকে আপনার পরিচয় দিন।” বানরটি তখন মৃদু হাসি দিয়ে বলেন, “আমি পবনপুত্র হনুমান।” এই কথা শুনে ভীম নতজানু হয়ে প্রণাম করলে মহাবলী হনুমান তাঁকে আলিঙ্গন করেন। হনুমান ভীমকে আশীর্বাদ দিয়ে বলেন যে, তিনি অর্জুনের বিজয়ের পতাকায় অবস্থান করে এমন গর্জন করবেন, যা শত্রুদের দুর্বল করে দেবে এবং পাণ্ডবদের জয় সহজতর করবে। এই আশীর্বাদ পেয়ে ভীম তাঁর ভাইদের কাছে ফিরে যান। দুই বায়ুপুত্রের এই মহামিলন পাণ্ডবদের মনোবল আরও শক্তিশালী করে তোলে এবং তাদের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ করে।