নিজস্ব প্রতিনিধি: হিন্দু সনাতন শাস্ত্রে বজরংবলী এক গভীর রহস্যে ভরা। তিনি সঙ্কটমোচন ও অপার শক্তিধর। তিনি কখনও অতি ক্ষুদ্র বা কখনও অতিকায় আকৃতি নিতে পারেন। তিনি প্রকৃতপক্ষে দেবাদিদেব মহাদেবের অবতার। পুরাণ মতে জানতে পারা যায়, তিনি অখণ্ড ব্রহ্মচারী, কিন্তু অবাক করা বিষয় তিনি বিবাহ বন্ধনেও আবদ্ধ হয়েছিলেন। আবার, তাঁর ঘামের ফোঁটা থেকে জন্ম হয়েছিল মকরধ্বজের। এক্ষেত্রে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে, হনুমানজীর স্ত্রী কে ছিলেন?
পৌরাণিক কাহিনি থেকে জানতে পারা যায়, ভগবান হনুমানের শৈশবের অন্যতম আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় গল্প হল সেই সময়ের, যখন তিনি সূর্যকে একটি পাকা আম ভেবে খেয়ে ফেলতে যাচ্ছিলেন। এই গল্পটি শুধুমাত্র রোমাঞ্চকরই নয়, বরং তাঁর শিশুসুলভ নিষ্কলুষতা এবং অসীম শক্তির পরিচয়ও বহন করে।
গল্প অনুযায়ী, হনুমান অঞ্জনী ও কেশরীর পুত্র এবং বায়ু দেবতার আশীর্বাদে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। ছোটবেলায় তিনি অত্যন্ত চঞ্চল ও দুষ্টু ছিলেন। একদিন সকালে, তিনি আকাশে উদিত লাল সূর্যকে দেখে ভাবলেন এটি একটি বড়, রসালো আম। শিশুসুলভ নিষ্কলুষতায় তিনি সঙ্গে সঙ্গে আকাশে লাফ দিয়ে উঠলেন সূর্যকে খেতে। এই ঘটনা মহাবিশ্বে বিশাল আলোড়ন তোলে। হনুমান যখন সূর্যের দিকে এগোতে থাকেন, সূর্যের প্রচণ্ড তাপও তাঁকে থামাতে পারেনি। মহাবিশ্বের ভারসাম্য নষ্ট হতে চলেছে দেখে দেবতারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন । তখন তাঁরা দেবরাজ ইন্দ্রের শরণাপন্ন হন।
অতঃপর, দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর বজ্র দিয়ে হনুমানকে আঘাত করেন। বজ্রের আঘাতে হনুমান মাটিতে পড়ে যান এবং তাঁর চিবুকে (সংস্কৃতে “হনু”) চিরস্থায়ী একটি ক্ষতচিহ্ন রয়ে যায়। এই কারণেই তাঁর নাম হয় “হনুমান”। এই ঘটনায় বায়ু দেবতা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন। তিনি সমস্ত পৃথিবী থেকে বায়ু সরিয়ে নেন, যার ফলে প্রাণিকুল কষ্টে পড়ে যায়। তখন দেবতারা ভুল বুঝতে পেরে হনুমানকে আবার সুস্থ করে তোলেন এবং একে একে তাঁকে নানা আশীর্বাদ ও অলৌকিক শক্তিতে ভূষিত করেন। এই ঘটনাটির কিছু সময় পরেই ভগবান হনুমান সূর্যদেবের ‘শিষ্য’ হন। সূর্যদেব তখন হনুমানকে নয়টি বিদ্যা (নব বিদ্যা) শেখানোর গুরুদায়িত্ব গ্রহণ করেন।
একটি অল্প পরিচিত পুরাণ অনুসারে হনুমানজীর বিবাহের একটি কাহিনি আছে। এই কাহিনি অনুযায়ী, সূর্যদেব তাঁর কন্যা সুভর্চলার সঙ্গে হনুমানের বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যাতে হনুমান সম্পূর্ণ বিদ্যার জ্ঞান অর্জন করতে পারেন। আসলে এই নয়টি বিদ্যার মধ্যে প্রথম পাঁচটি বিদ্যা সূর্যদেব অতি সহজেই ও নির্দ্বিধায় হনুমানকে প্রদান করেন। কিন্তু শেষ চারটি বিদ্যা শেখানোর ক্ষেত্রে একটি সমস্যা দেখা দেয়। এই সমস্যা ছিল ধর্মীয় ও আচারগত শর্ত সংক্রান্ত। পুরাতন শাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী, শেষ চারটি বিদ্যা শুধুমাত্র একজন গার্হস্থ্য জীবনযাপনকারী অর্থাৎ বিবাহিত পুরুষকেই দেওয়া সম্ভবপর ছিল। এই বিধি ছিল কঠোর এবং ব্যতিক্রমহীন। অন্যদিকে, ভগবান হনুমান ছিলেন অটল ব্রহ্মচারী। তিনি জন্ম থেকেই ব্রহ্মচর্য পালন করে আসছেন এবং জীবনের শেষ পর্যন্ত সেই ব্রত রক্ষা করবেন বলে সংকল্প করেছিলেন। এই অবস্থায় তাঁর পক্ষে বিবাহ করা এবং সংসার জীবন শুরু করা একেবারেই সম্ভব ছিল না।
তখন সূর্যদেব একটি অসাধারণ সমাধানের প্রস্তাব দেন। তিনি হনুমানকে বলেন যে, যদি হনুমান এমন এক কন্যার সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, যিনি নিজেও তপস্বিনী এবং বিবাহের পর গার্হস্থ্য জীবন গ্রহণ না করে কঠোর ব্রহ্মচর্য ও সাধনায় জীবন অতিবাহিত করবেন, তাহলে এই বিবাহ আচারদিক থেকে সম্পূর্ণ হবে এবং হনুমান তাঁর ব্রতও অক্ষুণ্ণ রাখতে পারবেন। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, সূর্যদেব নিজেরই কন্যা সুভর্চলা-কে এই উদ্দেশ্যে বিয়ে দেওয়ার কথা বলেন।
কথিত আছে, সুভর্চলা ছিলেন এক তপস্বিনী নারী, যিনি নিজের ইচ্ছায় বিবাহের পর সংসার জীবনে প্রবেশ না করে তপস্যায় লিপ্ত থাকার প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন। হনুমান এই শর্তে সম্মত হন, এবং সূর্যদেবের উপস্থিতিতে আচার অনুযায়ী তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হয়। বিবাহের পর সুভর্চলা সন্ন্যাসগ্রহণ করে কঠোর তপস্যায় জীবন অতিবাহিত করেন এবং হনুমান তাঁর ব্রহ্মচর্য জীবন বজায় রেখে শিক্ষালাভে মনোনিবেশ করেন। এভাবেই চিরন্তন জ্ঞানের পূর্ণতা লাভ করেন ভগবান হনুমান।
এইভাবে, ধর্মীয় শর্ত মেনে এবং ব্যক্তিগত ব্রত অক্ষুন্ন রেখে ভগবান হনুমান সমস্ত ৯টি বিদ্যা অর্জন করেন এবং এক অনন্য জ্ঞান ও শক্তির আধার হয়ে ওঠেন। এই কাহিনী তাঁর কেবল ব্রহ্মচর্য নয়, বরং তাঁর অনমনীয় সাধনা, ভক্তি এবং গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের গুরুত্বের একটি অপূর্ব উদাহরণ। এই দুটি গল্পেই ভগবান হনুমানের অসীম শক্তি, নিষ্কলুষতা, জ্ঞান এবং ধর্মপথে তাঁর অবিচল নিষ্ঠা প্রকাশ পায়।
জনশ্রুতি আছে, সমগ্র ভারতে এমন মন্দির একটিই রয়েছে, যেখানে ভগবান হনুমান এবং তাঁর পত্নী দেবী সুভর্চলা—একসাথেই পূজিত হন। এই অনন্য মন্দিরটি অবস্থিত তেলেঙ্গানার খাম্মাম (Khammam) জেলায়। এটি দেবী সুভর্চলা মন্দির নামে পরিচিত এবং এই মন্দিরে দেবী সুভর্চলা ও হনুমানজির যুগল মূর্তি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এই মন্দিরে ভক্তরা ভগবান হনুমান ও দেবী সুভর্চলার যুগল আরাধনা করেন, যা দেশের অন্যান্য হনুমান মন্দির থেকে একে আলাদা করে তোলে। যারা বিদ্যা, জ্ঞান ও ব্রহ্মচর্যের সাধনা করেন, মূলত তাঁদের কাছে মন্দিরটি আধ্যাত্মিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।