নিজস্ব প্রতিনিধি: ২০০০ সালে যখন প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, তাঁকে সেই সময় অন্য কোনও সরকারি ভবনে থাকার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। চাইলেই সরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকতে পারতেন তিনি, কেননা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সরকারি বাসভবনে থাকার বন্দোবস্ত করা হয়। কিন্তু, কলকাতার(Kolkata) পাম অ্যাভিনিউয়ের(Pam Avenue) ফ্ল্যাট ছাড়তে চাননি তিনি। আজ কিন্তু সেই ফ্ল্যাট ছাড়তেই হল তাঁকে। তবে সান্ত্বনা এটাই যে তিনি জীবিত অবস্থায় দেখতে পেলেন না যে তাঁকে তাঁর সাধের ফ্ল্যাট ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে চিরতরে। হয়তো তাই আত্মিক ভাবেই শেষ বিদায় জানালেন তাঁর প্রিয় পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িকে। বিদায় বুদ্ধ। ভালো থেকো।
আরও পড়ুন ‘বার বার তিনি ফিরে আসুন এই বাংলার মাটিতে’, বুদ্ধ স্মরণে মমতা
এদিন সকালে নিজের পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িতেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী(Former Chief Minister of West Bengal) বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য(Buddhadeb Bhattacharya)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০। এদিন দুপুরে তাঁর নিথর দেহ চিরতরে বেড়িয়ে গেল সেই পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়ি থেকে। পিছনে রয়ে গেল তাঁর স্ত্রী মীরা ভট্টাচার্য এবং তাঁর পুত্র সুচেতন ভট্টাচার্য। আর পড়ে রইল বই, বিছানা, গানের ক্যাসেট যা নিয়ে ছিল তাঁর নিত্যদিনের জীবনযাপন। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর দেহ ঢেকে দেওয়া হয়েছিল দলের পতাকায়। গলায় ছিল লাল সাদা ফুলের মালা। শবদেহবাহী গাড়ি তাঁকে নিয়ে ধীরে ধীরে রওয়ানা দেয় Peace World’র পথে। গণসঙ্গীত, লাল সেলামের ধ্বনি চলল সেই গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে। নাহ, গাড়ি বলা ভুল হবে, বুদ্ধের সঙ্গে। কাউকে কাউকে দেখা গেল চোখের জল মুছতে। কেউ কেউ তো হাউ হাউ করে কাঁদছেন। সেই গাড়ির মধ্যে শায়িত বামনেতার মুখও দেখা গেল খুব কাছ থেকেই। মোটা ফ্রেমের চশমা। থুতনিতে কিছুদিনের না কামানো দাড়ি। আগামিকাল বেলা ১১টায় শুরু হবে তাঁর শেষ যাত্রা। প্রথমে রাজ্য বিধানসভায়, তারপর সিপিএমের রাজ্য দফতর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে। সেখানেই মরদেহ শায়িত থাকবে বিকাল ৪টে পর্যন্ত। সাধারণ মানুষ সেখানেই তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে পারবেন। তারপর মিছিল করে দেহ নিয়ে যাওয়া হবে শিয়ালদহের এন আর এস হাসপাতালে। সেখানেই বুদ্ধদেবের দেহ দান করা হবে ভবিষ্যতের চিকিৎসার গবেষণার কাজে।
আরও পড়ুন বুদ্ধ প্রয়াণে ট্যুইটে শোকবার্তা মমতার, যাবেন শেষ শ্রদ্ধা জানাতেও
হাসপাতালে থাকাটা মোটেই পছন্দ ছিল না তাঁর। বাড়ি যাওয়ার খবর পেলেই চোখে-মুখে ধরা পড়ত অনাবিল আনন্দ। মাত্র দু’কামরার ফ্ল্যাট। জীবনের শেষ দিনটাও কাটালেন সেই ফ্ল্যাটেই। হাসপাতালে যেতে হয়নি আর। সেই সুযোগও তিনি দেননি। জীবনের শেষ সময়টা ছিলেন প্রাণ প্রিয় বাড়িতেই। পাম অ্যাভিনিউয়ের সেই আবাসনের হতশ্রী অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ও(Mamata Banerjee)। কিন্তু সেই ফ্ল্যাট ছেড়ে কোনোদিন এক পা-ও নড়েননি বুদ্ধবাবু। প্রায় ৫০ বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁর ঠিকানা বদলায়নি কখনও। কেন এত টান ছিল ওই দুই কামরার ফ্ল্যাটবাড়িতে? অতীতে এক সাক্ষাৎকারে নিজেই জানিয়েছিলেন, ‘পুরনো অভ্যাস ছাড়তে পারব না। কোনও অভ্যাসই না। আমার বই, আমার টেবিল.. ছেড়ে আসতে পারব না। অসুবিধা হবে আমার। সেই কলেজ লাইফ থেকে যে ধরণের পোশাক পরতাম, এখনও তেমন পরি। যা খেতে পছন্দ করতাম, এখনও তাই খাই। যে ভাবে আড্ডা মারতাম, সেভাবেই আড্ডা মারি। ওটাই আমার সামাজিক স্তর। খুব বড়, একটা সাজানো গোছানো ঘরে গেলে আমার অস্বস্তি হবে, মনে হবে ফিশ আউট অব ওয়াটার। আমি গোঁড়া নই, খুব স্বাধীনতা প্রেমী। ওই ঘরে থাকাটাও আমার একটা স্বাধীনতা।’ সেই স্বাধীনতা তিনি বজায় রেখেছিলেন এদিন সকাল পর্যন্ত। স্বাধীনতা বজায় রেখেই এদিন শেষ বারের মতো বিদায় জানালেন পাম অ্যাভিনিউয়ের বাড়িকে।