নিজস্ব প্রতিনিধি, মাগুরা: দিদির শ্বশুরের পাশবিক ধর্ষণের শিকার মাগুরার আট বছরের একরত্তি শিশুকে চোখের জলে বিদায় জানালেন লাখো-লাখো জনতা। ছোট শিশুটিকে বিদায় জানাতে গিয়ে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ-কেউ বুক চাপড়ে বলতে থাকেন, ‘এ কোন দেশ? যেখানে কোমল নিষ্পাপ শিশুকে এভাবে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়।’
কয়েক দিন আগে মাগুরা শহরে দিদির শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল শ্রীপুর উপজেলার বাসিন্দা আট বছরের শিশুটি। গত বৃহস্পতিবার (৭ মার্চ) বেলা এগারোটা নাগাদ বেহুঁশ অবস্থায় শিশুটিকে মাগুরা হাসপাতালে নিয়ে যান দিদির শাশুড়ি। হাসপাতালের চিকিৎসকেরা পরীক্ষার সময়ে দেখতে পান, নির্যাতিতার গলায় দাগ রয়েছে। তাদের অনুমান, কিছু দিয়ে চেপে ধরা হয়েছিল। শরীরের বেশ কিছু জায়গায় আঁচড় আছে। তাঁর মাসিকের রাস্তায় রক্তক্ষরণ হয়েছে। শিশুটির শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় মাগুরা হাসপাতালের চিকিৎসকরা প্রথমে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেন। সেখানকার চিকিৎসকরা শিশুটির শারীরিক অবস্থা নিরীক্ষণ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেন। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটায় শিশুটিকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। মাঝে শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও বুধবার দু’বার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। তখনই হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। পুলিশের কাছে দায়ের কা অভিযোগে শিশুটির মা জানিয়েছেন, ‘তাঁর বড় মেয়ের শ্বশুরই ছোট শিশুটিকে ধর্ষণ করেছেন। আর ওই কাজে তাকে সহায়তা করেছেন বড় মেয়ের স্বামী, অর্থাৎ শিশুটির জামাইবাবু। গোটা ঘটনার কথা জানতে পেরে শিশুটির দিদির শাশুড়ি এবং ভাসুর প্রাণে মেরে ফেলার চেষ্টা করেন। অভিযোগের ভিত্তিতে চার জনকেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শুধু শ্বশুর নাকি জামাইবাবু ও দিদির ভাসুরও শিশুটিকে ধর্ষণ করেছিল, তা নিশ্চিত হতে ধৃতদের মধ্যে তিন জনের ডিএনএ পরীক্ষাও করা হয়েছে।
টানা আটদিন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই চালানোর পরে সেনা হাসপাতালের চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে বৃহস্পতিবার (১৩ মার্চ) দুপুরেই মৃত্যুর দেশে পাড়ি দেয় শিশুটি। সম্মিলিত সেনা হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক নিউরোলজির অধ্যাপক কর্নেল নাজমুল হামিদ জানিয়েছেন, ‘এদিন সকালে দুই বার শিশুটির কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। প্রথমবার কার্ডিয়াক আ্যারেস্টের পর সিপিআর দেওয়ার পর তার হৃৎস্পন্দন ফিরে এসেছিল। কিন্তু দ্বিতীয়বার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের পরে ফের সিপিআর দেওয়ার পরও তার হৃৎস্পন্দন আর ফিরে আসেনি।’ এক রত্তি শিশুটিকে না বাঁচাতে পারার জন্য বাংলাদেশ সেনার তরফে দুঃখপ্রকাশ করা হয়েছে।
এদিন ঢাকা থেকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে শিশুটির দেহ নিয়ে আসা হয় মাগুরায়। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে মরদেহ বহন করা হেলিকপ্টারটি মাগুরা স্টেডিয়ামে অবতরণ করে। সন্ধ্যা সাতটায় শহরের নোমানী ময়দানে শিশুটির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহটি গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। টানা আটদিনের লড়াই শেষে নিষ্পাপ ছোট্ট শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই অঘোষিত বনধের চেহারা নেয় মাগুরা। শেষবারের মতো শিশুটিকে বিদায় জানাতে সব কাজ ফেলে নোমানি ময়দানে জড়ো হয়েছিলেন লাখো জনতা। সেই ভিড়ে ছিল আট থেকে আশি- সবাই।