আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বিশ্বের মধ্যে অন্যতম ব্যস্ত শহর হল আফ্রিকার নাইজেরিয়া। নাইজেরিয়ার সর্বাধিক জনবহুল শহর ও আফ্রিকার বৃহত্তম শহর হল লাগোস। এই শহরটি (লাগোস)সমগ্র আফ্রিকার জন্য একটি প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র বলা যেতে পারে। হাজার হাজার মানুষ স্বপ্ন দেখতে ব্যস্ত এই রঙিন শহরে। তেমনই এই শহরটিতে রয়েছে বিপুল সংখ্যক মানুষ যাঁদের বাড়ি ঘর নেই। গৃহহীন অবস্থায় দিনের পর দিন কাটাচ্ছেন তাঁরা। তেমনই ৬০ বছর বয়সী একজন বৃদ্ধ এই শহরের অন্যতম বাসিন্দা। তবে তিনি গৃহহীন মানুষদের মধ্যে একজন।
পুরো নাম লিয়ায়ু সাআদু। প্রায় ৬০ বছর জীনবের অর্ধেকটাই পার করে ফেললেন সেতুর নিচে কাটিয়ে। অবশ্য লিয়ায়ু সাআদু একা নন। লাগোসের ওবালেন্দে সেতুর নিচে সাআদুর সঙ্গে বর্তমানে ৬০ জনের বেশি গৃহহীন মানুষ বাস করেন। সাআদুকে তাঁরা সকলে গুরু হিসেবে মেনে চলেন।
আর্থিক পরিস্থিতি মজবুত করতে, দারিদ্রতা মেটানোর আশায় নাইজেরিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই শহরটিতে দৈনিক অনেক মানুষই আসেন। তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগ ভাঙারি কুড়ানো, জুতা সেলাই বা কারখানার ছোটখাটো কাজ করেন। এইভাবে নিজেদের পেট চালান তাঁরা।
তবে নগর জীবনের প্রলোভনে পড়ে অনেকে জড়িয়ে পড়েন চুরি-ছিনতাই বা মাদক বিক্রির মতো অপরাধে। লাগোসে নবাগত ব্যক্তিদের এই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়া সম্পর্কে সতর্ক করেন সাআদু। এই নিয়ে তিনি খুব সচেতন। তাই তিনি নবাগতদের সতর্ক করে থাকেন।
এই নিয়ে সাআদু জানান, ‘ তাঁর বয়স ষাঠ। কয়েক মাস বা কয়েক বছর আগে এসেছেন এমন তরুণ রয়েছেন তাঁর সঙ্গে। যেহেতু তাঁরা নতুন। তাই তাঁদের পরামর্শ দেওয়াটা তিনি নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন। এর কারণ হিসেবে তিনি জানিয়েছেন, লাগোসে সহজেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। আর এখানে নবাগত তরুণদের দেখভাল করার কেউ নেই। তাই তিনি পরামর্শ দিয়ে থাকেন।’
সাআদুকে যাঁরা গুরু হিসেবে দেখেন, তাঁদের মধ্যে একজন হল তুকুর গারবা। পাঁচ বছর ধরে ওই সেতুর নিচে থাকছেন তিনি। যুবকের বয়স, ৩১ বছর। এই যুবক নাইজেরিয়ার উত্তর দিকের প্রায় ৬২১ মাইল দূরের কাতসিনা শহর থেকে লাগোসে এসেছেন।
সাআদুকে গুরু মানা নিয়ে গারবা জানান, ‘তিনি আমাদের বড় ভাইয়ের মতো। অনেক দিন আগে থেকেই তিনি এখানে আছেন। তাঁর অনেক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা রয়েছে। যা আমাদের জন্য জরুরি। কারণ, লাগোসে যে কেউ সহজে ‘লাইনচ্যুত’ হতে পারে।’ একইসঙ্গে গারবা আরও জানান, যাতে কেউ বিভ্রান্ত না হয়, তাই তাঁর শরন্নাপন্ন হয়ে থাকেন ।
উল্লেখ্য, ১৯৯৪ সালে নাইজেরিয়ার উত্তর-পশ্চিম জামফারা অঞ্চলের ছোট্ট শহর জুর্মি থেকে লাগোসে এসে ধীরে ধীরে নিজের বাসস্থান গড়ে তোলেন সাআদু। তবে তা সেতুর নিচে। ওই সময় আরও কিছু গৃহহীন ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। ইতিমধ্যে তাঁদের অনেকে হয়তো মারা গেছেন, নয়তো নিজ শহর বা গ্রামে ফিরে গেছেন। কিন্তু সাআদু সেই সেতুর নিচেই রয়ে গেছেন। সেতুর নিচে একটা অংশে নিজের থাকার জায়গাটা একভাবে গুছিয়ে নিয়েছেন সাআদু। সেখানে তাঁর আসবাব রয়েছে। তেমন কোন সামগ্রী নেই। সামগ্রী বলতে একটি গদি, কিছু বিছানা, একটি কাঠের আলমারি ও একটি মশারি রয়েছে। আর তেমন কিছু নেই।তবে এই আস্তানার বাসিন্দাদের অনেকেরই কোনো আসবাব নেই। তাঁরা মেঝেতে অন্যের পাতা মাদুর ভাগাভাগি করে থাকেন। এভাবেই কোনরকমের দিন চলে তাঁদের।
তবে সেখানকার বাসিন্দারা কেউ খাবার তৈরি করেন। কেউ ছোট কারখানায় কাজ করেন। কেউ বা পেশায় মুচির কাজ করেন। তবে লাগোসে প্রথম জীবনে মুচির কাজ করতেন সাআদু। এই শহরটিতে শহরটিতে তিন দশকের জীবনে ভাগ্যোন্নয়ন ঘটিয়ে এখন ভাঙারি বিক্রির কাজ করেন তিনি। তাঁদের শৌচাগার ও স্নানের জন্য বেশ মোটা অঙ্কের গাঁটের কড়ি খরচ করতে হয় তাঁদের। ব্যয়বহুল শহরটিতে দৈনিক তিন ডলার আয় দিয়ে জীবন ধারণ করা সাআদু এবং তাঁর মত মানুষজনদের জন্য বেশ কষ্টের।
লাগোসে গৃহহীন মানুষের কত সংখ্যা রয়েছে তা জানা না গেলেও বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের তথ্যমতে, গৃহহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় পাঁচ লক্ষ। তাঁদের অভিযোগ রয়েছে, এসব গৃহহীন মানুষের দিকে নাইজেরিয়া সরকারের তেমন কোনো মনোযোগ নেই। তাঁদের নিয়ে কেউ ভাবনা চিন্তা করে না। উল্টে তাঁদের বিভিন্ন রকমের হয়রানির শিকার হতে হয়।