নিজস্ব প্রতিনিধি, কটক: কথায় বলে চেষ্টায় কি না হয়। মানুষ যদি মন থেকে সম্পূর্ণ একাগ্রতার সঙ্গে কোনও বিষয়ে চেষ্টা করে তাতে ফল অবশ্যই আসে। আর এর প্রত্যক্ষ প্রমাণ বেঙ্গালুরুতে নির্মাণ শ্রমিক শুভম। ওড়িশার প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দা শুভম কর্নাটকের বেঙ্গালুরুতে নির্মাণ শ্রমিকের কাজ করতেন। বয়স ১৯ বছর, চোখে ছিল ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন। তাই দিনমজুরের কাজের সঙ্গে সঙ্গেই চলত পড়াশোনা। এরপর একদিন শুভম জাতীয় যোগ্যতা ও প্রবেশিকা পরীক্ষা অর্থাৎ নিট(NEET) পরীক্ষায় বসলেন। সকল প্রতিবন্ধকতা বাধাকে পিছনে ফেলে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন তিনি। শুভমের এই ঘটনা প্রত্যেকের জন্যই এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
ওড়িশার খুরদা জেলার বানপুর ব্লকের মুদুলিডিয়া গ্রামের বাসিন্দা শুভম। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের ছেলে। পরিবারটির অবস্থা নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতো। বাড়িতে পাঁচজনের সংসার, বাবা-মা, শুভম এবং দুই বোন। ছোট থেকেই মেধাবী শুভম পড়াশোনা অনেক দূর পর্যন্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়ায় আর্থিক অবস্থা। অর্থনৈতিক অনটনের কারণে তাঁকে চলে যেতে হয় বেঙ্গালুরু। তবে যাওয়ার আগে ওই লাগলে তুক না লাগলে তাকের মতো ভাগ্যের উপর ভরসা করে নেট পরীক্ষা দিয়ে গিয়েছিলেন এই তরুণ।
তারপর তো নির্মাণ শ্রমিকের কাজ শুরু করা। কিন্তু শুভমের চোখ থেকে স্বপ্ন হারায়নি। বেঙ্গালুরুতে কাজ করে ৪৫ হাজার টাকা উপার্জন করেন তিনি। তার মধ্যে ২৫ হাজার টাকা সঞ্চয় করে। জুলাই মাসে এক সকালে তিনি যখন কাজ করছেন তখন শুভমের ফোনে ফোন আসে শিক্ষক বাসুদেব মহারানার থেকে। তিনি বলেন, “মিষ্টি খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হও। তুমি নিট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে।” এই খবর পাওয়ার পর প্রথমে বিশ্বাসই করতে চাননি শুভম। আনন্দে কেঁদে ফেলেন তিনি। তারপর তড়িঘড়ি ঠিকাদারদের কাছ থেকে ছুটি নিয়ে গ্রামে ফিরে আসেন।
শুভম নিট পরীক্ষায় তপশিলি বিভাগে ১৮,২১৩ তম স্থান অধিকার করেছেন এবং ওড়িশার এমকেসিজি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। শুভম সেই যে সঞ্চয় করেছিলেন বেঙ্গালুরুতে নির্মাণকাজ করে, তাতেই কোচিং সেন্টারের বকেয়া মিটিয়েছেন। মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছেন ছেলে। গর্বিত মার রাঙ্গী দেবী। তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই ও খুব পরিশ্রমী এবং মেধাবী। ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য ও প্রচুর পরিশ্রম করেছে। সেই কঠোর পরিশ্রমই ওকে সাফল্য এনে দিয়েছে।”
আর বাবা সাহাদেবের মুখে চওড়া হাসি। তিনি জানিয়েছেন আর্থিক ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু তাও পড়াশোনা থেকে কখনওই ছেলেকে নিরুৎসাহিত করেননি। এখন বাবা-মার একটাই আশা ছেলে পাঁচ বছর মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করার পর তাদের আর্থিক অবস্থা ফিরবে। শুভম ভবিষ্যতে সমাজের দরিদ্র পিছিয়ে পড়া মানুষের সেবায় নিয়োজিত হন, এটাই চাইছেন বাবা মা।