নিজস্ব প্রতিনিধি, ভোপাল: বিয়ের পরপরই মধুচন্দ্রিমায় মেঘালয় চলে গিয়েছিলেন ইন্দোরের বাসিন্দা নবদম্পতি রাজা রঘুবংশী এবং সোনম রাজবংশী। আচমকা সেখান থেকে তাঁদের হারিয়ে যাওয়া পুলিশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সন্দেহ করা হচ্ছিল মেঘালয়ের বাসিন্দাদের নিয়ে। প্রত্যন্ত এলাকায় পাঠানো হয়েছিল একের পর এক পুলিশের দল। শত শত সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছিল, কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। অবশেষে ঘটনার দশ দিন পর একটি খাদ থেকে উদ্ধার হয় রাজা রঘুবংশীর দেহ। কিন্তু সোনম তখনও নিখোঁজ। বাংলাদেশ সীমান্ত কাছে হওয়ায় সন্দেহ করা হচ্ছিল হয়তো সোনমকে বাংলাদেশে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সারা মেঘালয় জুড়ে যখন খড়ের গাদায় সূঁচ খুঁজছে পুলিশ, সেই সময় তাদের কাছে ত্রাতা হয়ে আসেন স্থানীয় এক ট্যুর গাইড। নাম তাঁর অ্যালবার্ট পিডি। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া একটি তথ্য পুলিশকে এমন একটি সূত্রের দিকে নিয়ে যায় যা সোনম রাজবংশীর বিশ্বাসঘাতকতা ও রাজা রঘুবংশীর হত্যার নেপথ্যে থাকা যাবতীয় ঘটনাকে উন্মোচিত করে।
অ্যালবার্ট জানিয়েছিলেন, ২২ মে তিনি সোনম এবং রাজাকে তিনজন পুরুষের সঙ্গে নোংরিয়াত থেকে মাওলাখিয়াত পর্যন্ত তিন হাজারেরও বেশি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে দেখেছিলেন। গাইডের মতে, রাজা ওই চারজন পুরুষের সঙ্গে সামনে হেঁটে যাচ্ছিলেন, সোনম ছিলেন পিছনে। তাঁরা সকলেই হিন্দিতে কথা বলছিলেন। অ্যালবার্ট জানান, তিনি হিন্দি বোঝেন না। কিন্তু এইটুকু বুঝতে পেরেছিলেন এই এই পাঁচ জনের মধ্যে কিছু একটা ঠিক নেই।
এর আগে অ্যালবার্ট সোনম-রাজার গাইড হয়েছিলেন। পরে তাঁরা অ্যালবার্টকে ছেড়ে ভবনসাই নামে আর এক গাইডের সাহায্য নেন। এই ভবনসাই সোনম রঘুবংশীদের শিপ্রা হোম স্টে’তে রেখে এসেছিলেন।
হানিমুনে যাওয়া থেকে শুরু করে গিয়ে পর্যন্ত সোনম সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও ছবি আপলোড করেননি। বর্তমানে বেশিরভাগ মানুষই সোশ্যাল মিডিয়া কেন্দ্রিক। সারাদিনের খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে কোথাও ঘুরতে গেলেও মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় তথ্য, ছবি আপলোড করেন। বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে এটি বেশি লক্ষ্যণীয়। সোনমের বয়স ২৬ বছর, এ যুগের মেয়ে হয়েও ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে তার বেড়াতে যাওয়ার কোনও ছবি নেই। নবদম্পতির ক্ষেত্রে এই বিষয়টা খুব একটা স্বাভাবিক লাগেনি পুলিশের।
বরং ২৩ মে দুপুর ২:১৫ মিনিটে রাজার প্রোফাইল থেকে একটি পোস্ট করা হয়। বিষয়বস্তু ছিল, তাঁরা সাত জন্মের জন্য এক হয়েছেন। পরে পুলিশ জানতে পারে এই পোস্টটি রাজা খুন হয়ে যাওয়ার পরে তাঁর ফোন থেকে করা হয়। পুলিশের বিশ্বাস, তদন্তকে বিভ্রান্ত করার জন্যই এই পোস্ট করেছিল সোনম। সে চেয়েছিল সকলে জানুক যে রাজা বেঁচে আছে এবং ভাল আছে।
পুলিশ একটি সিসিটিভি ফুটেজ পেয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে খুনের ঘটনাস্থল থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে অভিযুক্ত আকাশ, বিশাল ও আনন্দের সঙ্গে কথা বলছে সোনম। বিশাল চৌহানই প্রথম রাজার উপর আক্রমণ চালায়। তাকে সঙ্গ দেয় আনন্দ কুর্মি। খুনে ব্যবহৃত অস্ত্রটি গৌহাটি রেল স্টেশনের কাছে একটি দোকান থেকে কেনা। অতঃপর একথা স্পষ্ট যে খুনের ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত।
হত্যার পরপরই সোনম গৌহাটির উদ্দেশ্যে রওয়া হয়। তারপর সেখান থেকে শিলিগুড়ি হয়ে ২৫ মে ইন্দোর পৌঁছায়। সেখানে প্রেমিক রাজ কুশওয়াহার সঙ্গে দেখা করে একদিনের জন্য একটি হোটেলে থাকে। এরপর গাড়ি করে বারানসী হয়ে গাজিপুরে পৌঁছে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে।
রাজাকে রাস্তা থেকে সরিয়ে প্রেমিক রাজ কুশওয়াহার সঙ্গে ঘর বাঁধতে চেয়েই এই পরিকল্পনা করে সোনম। সেই জন্যই ইন্দোর থেকে বহু দূরে মেঘালয়ে হানিমুন প্ল্যান, সঙ্গে করে ভাড়াটে গুন্ডা নিয়ে যাওয়া।