পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : নাসৈ রোগ হরৈ সব পীড়া
জপত নিরন্তর হনুমতবীরা
ভারতের বিভিন্ন স্থানে বহু প্রাচীন মন্দির রয়েছে। এই মন্দিরগুলির মধ্যে সঙ্কটমোচন হনুমানেরও মন্দিরের সংখ্যা অনেক। জানা যায়, ভারতের উত্তর প্রদেশের প্রয়াগরাজ শহরে অবস্থিত আনুমানিক ৭০০ বছরের পুরনো “শ্রী বড়ে হনুমান জি” মন্দির, যা “লেটে হনুমান” মন্দির নামেও পরিচিত। হিন্দু ধর্মের একটি বিশেষ তীর্থস্থান। এই মন্দিরের প্রধান আকর্ষণ হল ভগবান হনুমানের একটি বিরাট প্রতিমা, যা শায়িত অবস্থায় স্থাপিত এবং আংশিকভাবে গঙ্গা নদীর জলে নিমজ্জিত। এই অনন্য বৈশিষ্ট্য মন্দিরটিকে অন্যান্য হনুমান মন্দিরের থেকে পৃথক করেছে। এই বিশেষ শায়িত হনুমান বিগ্রহের জন্যই এই হনুমানজী লেটে হুয়ে হনুমান বা শোওয়া হনুমান নামে পরিচিত।
মন্দিরের অবস্থান ও গুরুত্ব
মন্দিরটি প্রয়াগরাজের ত্রিবেণী সঙ্গমের নিকটবর্তী, যেখানে গঙ্গা, যমুনা এবং পৌরাণিক সরস্বতী নদীর মিলনস্থল। সঙ্গমের সান্নিধ্যের কারণে মন্দিরটি বিশেষ ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে এবং প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ভক্তের আগমন ঘটে, বিশেষ করে কুম্ভ মেলা এবং হানুমান জয়ন্তীর সময়।
প্রতিমার শায়িত অবস্থার নেপথ্যে কিংবদন্তি
মন্দিরের শায়িত হনুমান প্রতিমার পেছনে একটি জনপ্রিয় কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। বলা হয়, কনৌজের এক ধনী ব্যবসায়ী সন্তান লাভের আশায় বিন্ধ্যাচল পর্বতে ভগবান হনুমানের একটি মন্দির নির্মাণ করেন এবং একটি বিশাল পাথরের প্রতিমা স্থাপন করেন। তিনি প্রতিমাটিকে বিভিন্ন পবিত্র স্থানে স্নান করানোর পর প্রয়াগরাজের সঙ্গমে পৌঁছান। সেখানে এক স্বপ্নে নির্দেশ পান যে, যদি তিনি প্রতিমাটিকে সঙ্গমে স্থাপন করেন, তবে তার ইচ্ছা পূরণ হবে। সেই অনুযায়ী, তিনি প্রতিমাটি সঙ্গমে রেখে যান এবং পরবর্তীতে তার সন্তান লাভ হয়। সময়ের সাথে সাথে প্রতিমাটি নদীর তলদেশে নিমজ্জিত হয় এবং বর্তমানে এটি শায়িত অবস্থায় মন্দিরে পূজিত হয়।
মন্দিরের স্থাপত্য ও বৈশিষ্ট্য
মন্দিরটি একটি ভূগর্ভস্থ গর্ভগৃহে অবস্থিত, যেখানে হনুমানজির ২০ ফুট দীর্ঘ শায়িত প্রতিমা স্থাপিত। এটি বিশ্বের একমাত্র মন্দির যেখানে হনুমানজিকে এইভাবে শায়িত অবস্থায় পূজা করা হয়। বর্ষাকালে গঙ্গার জলস্তর বৃদ্ধি পেলে প্রতিমাটি আংশিকভাবে জলে নিমজ্জিত হয়, যা ভক্তদের কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও উৎসব
মন্দিরে প্রতি বছর হানুমান জয়ন্তী, রাম নবমী এবং নরক চতুর্দশীর মতো প্রধান উৎসব উদযাপিত হয়। বিশেষ করে মঙ্গলবার এবং শনিবারে ভক্তদের ভিড় বেশি থাকে, কারণ এই দিনগুলোতে হনুমানজির পূজা বিশেষ ফলপ্রসূ বলে মনে করা হয়।
মন্দিরে পৌঁছানোর উপায়
প্রয়াগরাজ রেলওয়ে স্টেশন থেকে মন্দিরের দূরত্ব প্রায় ৭ কিলোমিটার এবং এটি সড়কপথে সহজেই পৌঁছানো যায়। মন্দিরের নিকটেই রয়েছে এলাহাবাদ দুর্গ, যা মুঘল সম্রাট আকবর দ্বারা নির্মিত একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা।
সাম্প্রতিক উন্নয়ন ও সংস্কার
২০২৫ সালের মহাকুম্ভ মেলাকে সামনে রেখে মন্দিরে ব্যাপক সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ চলেছে। এর মধ্যে রয়েছে গর্ভগৃহের সম্প্রসারণ, পরিক্রমা পথের নির্মাণ, নতুন দোকানপাট, পার্কিং এলাকা এবং প্রবেশদ্বারের সংস্কার।
নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, শ্রী লেটে হুয়ে হনুমান জি মন্দির শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় স্থাপনা নয়, এটি ভারতের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যের প্রতীক। মন্দিরের শায়িত হনুমান প্রতিমা, সঙ্গমের সান্নিধ্য এবং ইতিহাসের সাথে জড়িত কিংবদন্তি একে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করেছে। ভক্তদের বিশ্বাস, এখানে প্রার্থনা করলে সকল ইচ্ছা পূরণ হয় এবং জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি আসে।