পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : হাত বজ্র ও ধ্বজা বিরাজৈ ৷
কাঁধে মূঞ্জ জেনেউ সাজৈ।।
অখণ্ড ব্রহ্মচারী কোটি সূর্য তেজ সমৃদ্ধ মহাবলী হনুমানের মহিমা অপরিসীম। তিনি হলেন একজন প্রাচীন হিন্দু দেবতা ও মর্যাদা পুরুষোত্তম রামের ঐশ্বরিক বানর সঙ্গী। যিনি পবনপুত্র কিংবা অঞ্জনীপুত্র এবং দেবাদিদেব মহাদেবের অবতার হিসেবেও পরিচিত। পৌরাণিক কাহিনী মতে, হনুমান হলেন অষ্টচিরঞ্জীবীর একজন। অর্থাৎ হনুমান অমর, তাঁর মৃত্যু নেই। শাস্ত্র অনুসারে মঙ্গলবার শ্রী হনুমানের উদ্দেশ্যে নিবেদিত। এই দিনে বজরংবলীর বিশেষ পুজো করা হয়। মনে করা হয়, তিনি তাঁর ভক্তদের সকল বিপদ থেকে রক্ষা করেন আর তাই তিনি সঙ্কটমোচন নামেও পরিচিত। তবে আমরা অনেকেই হনুমানজীর পাঁচ মুখওয়ালা মূর্তি দেখতে পাই। জানেন কী, তিনি কেন এই পঞ্চমুখী রূপ নিয়েছিলেন ?
“রামায়ণ”-এর লঙ্কাকাণ্ডের বর্ণনা অনুসারে, রাবণ তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত বুঝতে পেরে মহীরাবণ এবং অহিরাবণের সাহায্য চান। তাঁরা দুজনেই ছিলেন পাতালপুরীর শাসক। অহিরাবণ ছিলেন রাবণের ভাই এবং পাতাল রাজ্যের অধিপতি, অন্যদিকে মহীরাবণ ছিলেন রাবণের পুত্র, যিনি পাতাল রাজ্যের রাজা ছিলেন। অতঃপর মহীরাবণ বিভীষণের রূপ ধারণ করে রাম-লক্ষ্মণের শিবিরে আসেন ও দুজনকে অপহরণ করে নিয়ে যান পাতালে। এরপর বজরঙ্গী হনুমান রাম-লক্ষ্মণকে খুঁজতে পাতালে যান। গিয়ে দেখেন দ্বারে প্রহরায় আছেন মকরধ্বজ। এই মকরধ্বজের জন্ম নিয়েও আছে আর এক কাহিনী। রামায়ণ অনুযায়ী, মকরধ্বজের জন্মের পিছনে হনুমানের অবদান আছে। কথিত আছে, হনুমানের এক ফোঁটা ঘাম থেকে মকরধ্বজের জন্ম হয়েছিল। তাই‚ মকরধ্বজ হনুমানকে নিজের পিতা ভাবতেন। পাতালের প্রবেশপথে মকরধ্বজকে দেখে হনুমান নিজের পরিচয় তাঁকে দেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁকে প্রণাম করে পথ ছেড়ে দেন মকরধ্বজ।
হনুমান পাতালে প্রবেশ করে দেখেন মহীরাবণ এবং অহিরাবণ পাতাল ভৈরবীর কাছে রাম ও লক্ষণকে বলি দেবেন বলে পুজো শুরু করেছেন। তার পাশেই জ্বলছে পাঁচটি প্রদীপ। হনুমান বুঝতে পারেন যে মহীরাবণকে বিনাশ করতে হলে সেই পাঁচটি দীপ একসাথে নেভাতে হবে। তাদের মুখ আবার পাঁচদিকে। তাই‚ হনুমান পাঁচটি মুখ ধারণ করলেন। কিংবদন্তি অনুসারে, হনুমানের একটি মুখ হল বরাহ-মুখের মতো, সেই মুখটি থাকল উত্তরদিকে। নরসিংহের মতো দেখতে মুখ থাকল দক্ষিণ দিকে। গরুড়রূপী মুখ থাকল পশ্চিমে। হয়গ্রীবা বা ঘোড়ার মুখ হল আকাশমুখী। আর‚ হনুমানের নিজস্ব মুখ থাকল পূর্বমুখী হয়ে। এই পঞ্চমুখ নিয়ে মহাশক্তিশালী হনুমান পাতালে প্রবেশ করে পাঁচদিকে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিলেন পাঁচটি দীপ। তারপর মহীরাবণের শিরচ্ছেদ করে বিনাশ করে উদ্ধার করেছিলেন রাম-লক্ষ্মণকে।
পঞ্চমুখী হনুমানের পাঁচটি মুখ ও তাদের তাৎপর্য
হনুমান মুখ (Monkey Face – পূর্ব দিক)
- এটি হনুমানের নিজস্ব মুখ, যা শক্তি, ভক্তি, সাহস ও আনুগত্য প্রকাশ করে।
- এই মুখ ভক্তদের সমস্ত ভয় দূর করে এবং তাদের সাহস ও আত্মবিশ্বাস প্রদান করে।
নারসিংহ মুখ (Lion Face – দক্ষিণ দিক)
- এটি ভগবান বিষ্ণুর নারসিংহ অবতারকে প্রতীকায়িত করে।
- এই মুখ অধর্মের বিনাশ এবং রাক্ষসদের ধ্বংসের শক্তি প্রদান করে।
- এটি ভক্তদের সমস্ত বিপদ ও বাধা থেকে রক্ষা করে।
গরুড় মুখ (Eagle Face – পশ্চিম দিক)
- এটি ভগবান বিষ্ণুর বাহন গরুড়ের প্রতীক।
- এই মুখ অমঙ্গল ও বিষধর সাপের প্রভাব থেকে রক্ষা করে।
- জীবনের সমস্ত বাধা, বাধা, ও দুর্ভাগ্য দূর করে এবং গতি ও মুক্তির শক্তি প্রদান করে।
বরাহ মুখ (Boar Face – উত্তর দিক)
- এটি বিষ্ণুর বরাহ অবতারের প্রতীক, যা ধারণ ক্ষমতা, স্থিরতা ও ধৈর্যের প্রতীক।
- এই মুখ পৃথিবীর ভার ধারণ করার শক্তি প্রদান করে এবং ভূমিকম্প বা অন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে।
হয়গ্রীব মুখ (Horse Face – উর্ধ্ব দিক)
- এটি ভগবান বিষ্ণুর হয়গ্রীব অবতারের প্রতীক, যা জ্ঞানের প্রতীক।
- এই মুখ বিদ্যা, জ্ঞান, এবং সূক্ষ্ম বুদ্ধি বৃদ্ধি করে, যা মানুষের জীবনে আলোর দিশা দেখায়।
পঞ্চমুখী হনুমান সাধনার গুরুত্ব
পঞ্চমুখী হনুমান রূপের পূজা করলে নিম্নলিখিত ফল পাওয়া যায়:
- ভয় ও বিপদ দূর হয়।
- জ্ঞান ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটে।
- অসুর, শত্রু ও অমঙ্গল দূর হয়।
- জীবনে স্থিতিশীলতা ও ধৈর্য আসে।
- সকল প্রকার বিষ, ভয় এবং দুর্ভাগ্য থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
পঞ্চমুখী হনুমান শুধুমাত্র একটি পৌরাণিক রূপ নয়, এটি একাধিক শক্তি ও গুণের সংমিশ্রণ। এই রূপ ধারণ করে তিনি শুধুমাত্র শ্রী রামকে রক্ষা করেননি, বরং বিশ্ববাসীকে একটি শিক্ষা দিয়েছেন— সাহস, ধৈর্য, জ্ঞান, ভক্তি ও রক্ষার শক্তির মাধ্যমে জীবনের সমস্ত বাধাকে জয় করা সম্ভব।
“জয় পঞ্চমুখী হনুমান”