পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : জয় হনুমান জ্ঞান গুণ সাগর ।
জয় কপীশ তিহু লোক উজাগর ॥
রামদূত অতুলিত বলধামা ।
অঞ্জনী পুত্র পবনসুত নামা ॥
ভারত নানা তীর্থের পুণ্যভূমি। এই দেশের নানা জায়গায় অবস্থিত বহু প্রাচীন মন্দির। তবে জানেন কী, ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের হাম্পির খুব কাছেই আনেগোন্ডি এলাকাতেই আছে শ্রী বজরংবলী হনুমানের জন্মস্থান ? জানা যায়, হাম্পির ঐতিহাসিক স্থান থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই অঞ্জনেয়াদ্রি পাহাড়’কে ভগবান হনুমানের জন্মস্থান হিসেবে মানা হয়, যা হিন্দু ভক্তদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও শ্রদ্ধার স্থান।
নাম ও পৌরাণিক কাহিনি
“অঞ্জনেয়াদ্রি” শব্দটির অর্থ “অঞ্জনার পাহাড়”। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, হনুমানের মা অঞ্জনা বা অঞ্জনী ছিলেন এক অপ্সরা, যিনি অভিশাপে পৃথিবীতে জন্ম নেন। তিনি সন্তান লাভের আশায় ভগবান শিবের কঠোর তপস্যা করেন। শিব তুষ্ট হয়ে তাঁকে বর দেন, যার ফলস্বরূপ অঞ্জনা হনুমানের জন্ম দেন। তাই হনুমানকে অঞ্জনেয়া (অঞ্জনার পুত্র) নামেও ডাকা হয়, এবং তাঁর জন্মভূমি হয়ে ওঠে অঞ্জনেয়াদ্রি। এই কাহিনি অনুসারে, অঞ্জনেয়াদ্রি পাহাড়টি শুধুমাত্র একটি ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং এটি একটি দিব্য স্থান, যেখানে ঈশ্বরের উপস্থিতি অনুভব করা যায়। সারা ভারত থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত এই পাহাড়ে আসেন প্রার্থনা করতে ও আশীর্বাদ লাভের আশায়।
মন্দিরে ওঠার পথ
পাহাড়ের শীর্ষে রয়েছে একটি সাদা রঙের, সাদা রঙে রঙ করা হনুমান মন্দির। এই মন্দিরে উঠতে হলে প্রায় ৫৭৫টি পাথরের সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়। যদিও এই পথটি কিছুটা কষ্টকর, তবু ভক্তদের জন্য এটি এক আত্মিক অভিজ্ঞতা। সিঁড়ি ভাঙার পথে প্রায়শই শোনা যায় “জয় হনুমান” ধ্বনি এবং ভক্তদের ঘণ্টাধ্বনি। মন্দিরটি সাদামাটা হলেও, তার মধ্যে রয়েছে গভীর এক আধ্যাত্মিক শক্তি। মন্দিরের ছাদে একটি পিরামিড আকৃতির গঠন রয়েছে, যার উপরে একটি ছোট লাল গম্বুজ স্থাপন করা আছে। অনেক দূর থেকেই দেখা যায়, পাহাড়ের উপরে লাল পতাকা উড়ছে, যা এই পবিত্র স্থানটির পরিচয় বহন করে।
হনুমান ও রাম-সীতার বিগ্রহ
মন্দিরের ভিতরে ভগবান হনুমানের একটি প্রাকৃতিক শিলার খোদাই করা মূর্তি রয়েছে। এটি অত্যন্ত প্রাচীন ও শক্তিময় বলে বিশ্বাস করা হয়। এছাড়াও, মন্দির চত্বরে রয়েছে ভগবান রাম ও সীতার একটি ছোট মন্দির। এটি রাম-ভক্ত হনুমানের চিরন্তন সম্পর্কের প্রতীক।
চূড়া থেকে অপূর্ব দৃশ্য
এই পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চারপাশের দৃশ্য এক কথায় অবিশ্বাস্য সুন্দর। এখান থেকে চোখে পড়ে সবুজ ধানের ক্ষেত, তুংভদ্রা নদী, এবং চারদিকে ছড়িয়ে থাকা হাম্পির ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন স্থাপত্য। ভোরবেলা সূর্যোদয় কিংবা সন্ধ্যায় সূর্যাস্তের সময় এখানকার দৃশ্য মন ছুঁয়ে যায়। শান্ত বাতাস, পাখির ডাক, এবং এক অনন্য নীরবতায় ভরা এই স্থানটি যেন এক আধ্যাত্মিক বিশ্রামের কেন্দ্র।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
অঞ্জনেয়াদ্রি পাহাড় শুধু ধর্মীয় স্থান নয়, এটি এক সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক। ভক্তি, সাহস, এবং সেবার আদর্শে জীবন কাটানোর অনুপ্রেরণা দেন ভগবান হনুমান। হনুমান জয়ন্তী উপলক্ষে এখানে বহু ভক্ত এসে পুজো ও উপবাস পালন করেন। সেই সময় বিশেষ পুজা, ভজন ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়।
দর্শনের তথ্য
- অবস্থান: আনেগোন্ডি গ্রাম, হাম্পি, কর্ণাটক।
- দূরত্ব: হাম্পি থেকে প্রায় ৫ কিমি।
- সেরা সময়: অক্টোবর থেকে মার্চ (আবহাওয়া মনোরম)।
- সময়সূচি: সাধারণত সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খোলা থাকে।
- নিয়ম: সিঁড়ি ওঠার আগে জুতা খুলে রাখতে হয়।
যাবেন কী ভাবে ?
- ট্রেনে যাত্রা:
- সবচেয়ে কাছের রেলস্টেশন হলো হোসপেট (Hospet Junction)।
- হোসপেট হাম্পির নিকটবর্তী বড় শহর, যা ভারতের বিভিন্ন শহরের সঙ্গে ট্রেনযোগে যুক্ত (যেমন বেঙ্গালুরু, হুবলি, গাদাগ, বিজয়নগর প্রভৃতি)।
- হোসপেট থেকে হাম্পি’র দূরত্ব প্রায় ১৫ কিমি।
- রেলস্টেশন থেকে অটো, ট্যাক্সি বা বাসে চড়ে সরাসরি হাম্পি পৌঁছানো যায়।
- হাম্পি থেকে অঞ্জনেয়াদ্রি পাহাড়: হাম্পি থেকে অঞ্জনেয়াদ্রি পাহাড়ের দূরত্ব মাত্র ৫ কিমি। এটি তুংভদ্রা নদীর অন্য পাড়ে অবস্থিত, আনেগোন্ডি গ্রামে।
যাওয়ার উপায়:
নৌকায় পারাপার (Coracle/Ferry Service):
- হাম্পি থেকে তুংভদ্রা নদী পার হয়ে আনেগোন্ডিতে যেতে পারেন।
- সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ছোট নৌকা বা করাকল পরিষেবা চলে, যা বেশ জনপ্রিয়।
- নদী পার হওয়ার পর পায়ে হেঁটে বা অটোতে পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছানো যায়।
সড়ক পথে (By Road): হাম্পি থেকে একটি স্থানীয় অটো বা ক্যাব ভাড়া করে সড়কপথে আনেগোন্ডি হয়ে সরাসরি অঞ্জনেয়াদ্রি পাহাড়ে পৌঁছাতে পারেন।
- সড়কপথে দূরত্ব প্রায় ১৫ কিমি (কারণ সেতুর মাধ্যমে নদী ঘুরে যেতে হয়)।
- রাস্তা ভালো এবং পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৩০-৪০ মিনিট।