নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: পহেলগাঁও কাণ্ডের পরেই পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মোদি সরকার। ওই সিদ্ধান্ত থেকে যে আপাতত পিছু হটছে না দিল্লি, সোমবার (১২ মে) রাতে তা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ ‘টেরর’ ও ‘টক’ (সন্ত্রাস এবং আলোচনা) একসঙ্গে চলতে পারে না। জল এবং রক্ত একই সঙ্গে বইতে পারে না।’ পাকিস্তানের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদ ও পাক অধিকৃত কাশ্মীর ছাড়া অন্য কোনও বিষয় নিয়ে কোনও আলোচনা নয় বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। অর্থাৎ সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন তিনি।
গত ২২ এপ্রিল কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের বৈসরন উপত্যকার এক রিসর্টে অতর্কিতে হানা দিয়ে নিরীহ পর্যটকদের উপরে এলোপাথাড়ি গুলি চালায় পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদীরা। গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান ২৬ পর্যটক সহ ২৮ জন। পাকিস্তানের মদতপুষ্ঠ জঙ্গি সংগঠন ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ জড়িত। যদিও পরে ওই সংগঠন হামলার দায় অস্বীকার করেছে। ওই হামলার পর গত ২৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবনে নিরাপত্তা সংক্রান্ত মন্ত্রীগোষ্ঠীর (সিসিএস) বিশেষ বৈঠক বসে।বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল সহ শীর্ষ আমলারা উপস্থিত ছিলেন। প্রায় দু’ঘন্টা ধরে চলে বৈঠক। ওই বৈঠকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, পাকিস্তানের সঙ্গে থাকা সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখা হবে। পাশাপাশি পাক নাগরিকদের আর কোনও ভিসা দেওয়া হবে না। সেই সঙ্গে যে ভিসা রয়েছে তা বাতিল করা হবে।
সিন্ধুর জল বন্ধ করা হলে রক্ত নদীর ধারা বইয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো। এমনকি পাকিস্তানের অন্যান্য নেতা-মন্ত্রীরাও একই রকমের হুঙ্কার ছেড়েছিলেন। যদিও তাতে লাভ হয়নি। পহেলগাঁও হামলার পরে গত তিন সপ্তাহে একাধিক নাটকীয় ঘটনা ঘটেছে। ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযানে পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরে থাকা জঙ্গি ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে ভারতীয় সেনা। আর তাতে গোঁসা হয় পাক সেনার। পাল্টা হামলা চালাতে শুরু করে ভারতে। যোগ্য জবাব দিয়েছে ভারতীয় সেনা। শেষ পর্যন্ত ৮৭ ঘন্টার লড়াই শেষে দুই দেশই যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়।
‘অপারেশন সিঁদুর’ নিয়ে এদিন জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ‘অপারেশন সিঁদুর’ অভিযানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের মদতপুষ্ঠ সন্ত্রাসবাদের সবচেয়ে বড় উদাহরন পহেলগাঁও কাণ্ড। সন্ত্রাসীবাদীদের হামলার জবাব দিতে সেনাবাহিনীকে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলাম। আমাদের দেশের পরাক্রমশালী সেনার বীর জওয়ান ও আধিকারিকরা যোগ্য জবাব দিয়েছেন। তাঁদের পরাক্রমকে আমরা উৎসর্গ করছি দেশের সব মা, সকল মহিলাদের। পহেলগাঁও হামলা ছিল ভারতের সম্প্রীতির উপরে আঘাতের চক্রান্ত। ছুটি কাটাতে যাওয়া পর্যটকদের স্ত্রী, বাচ্চার সামনে ধর্ম জিজ্ঞাসা করে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে। পহেলগাঁও হামলা ছিল ভারতের সম্প্রীতির উপরে আঘাতের চক্রান্ত। এটা ক্রূরতা। এই ঘটনার পরে সকলেই এক সুরে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সুর তুলেছেন। অপারেশন সিঁদুর ন্যায়ের প্রতীক। ভারতীয় সেনা শুধু পাক জঙ্গিদের পরিকাঠামোই ধ্বংস করিনি, তাদের মনোবলও ভেঙে দিয়েছে।জঙ্গিরা টের পেয়েছে, মা-বোনদের সিঁদুর মোছার পরিণাম কী?
সন্ত্রাসবাদীদের পাক সরকার গত তিন দশকের বেশি সময় ধরে ইন্ধন জুগিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিন দশক ধরে সন্ত্রাসবাদীরা পাকিস্তানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সন্ত্রাসবাদের ‘হেড কোয়ার্টার’ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তাতে হতাশ পাকিস্তান। ওরা বুঝতে পারছে না একদিন এই জঙ্গিরাই পাকিস্তানকে শেষ করে দেবে। ভারতের সঙ্গ দেওয়ার বদলে পাকিস্তান ভারতের উপরেই হামলা করল। আমাদের স্কুল-কলেজ, সাধারণ নাগরিকের বাড়িঘর, মন্দিরকে নিশানা করল। এখানেও ওরা ব্যর্থ হল। গোটা বিশ্ব দেখল, কী ভাবে পাকিস্তানের ড্রোন, মিসাইল ভারতের কাছে ধুলিসাৎ হল। তিন দিনে পাকিস্তানকে যা করা হয়েছে, তা ওরা ভাবতেই পারেনি। এখন ওরা বাঁচার রাস্তা খুঁজছে। দেশে দেশে ঘুরছে। প্রচণ্ড মার খাওয়ার পর ১০ মে পাকিস্তানি সেনা আমাদের ডিজিএমও-র দ্বারস্থ হন। তার আগে আমরা পাকিস্তানের মাটিতে থাকা সন্ত্রাসবাদীদের ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছি। প্রত্যেক যুদ্ধে আমরা পাকিস্তানকে পরাস্ত করেছি, অপারেশন সিঁদুরেও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়েছি। পাকিস্তানকে ধুলো চাটানো হয়েছে।’
সন্ত্রাসবাদীদের আর কোনও চোখরাঙানি ভারত সহ্য করবে না বলে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের সেনাবাহিনী সর্বদা সতর্ক। আকাশ, জল থেকে মাটি- সর্বত্র আমরা প্রস্তুত থেকেছি। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আবার জবাব দেওয়া হবে। কোনও ‘নিউক্লিয়ার ব্ল্যাকমেল’ ভারত সহ্য করবে না।’