নিজস্ব প্রতিনিধি, মেহসানা: যাবতীয় উৎকণ্ঠা-উদ্বেগের অবসান। বুধবার (১৯ মার্চ) ভোরে নিরাপদেই মহাকাশ থেকে পৃথিবীর বুকে ফিরে এলেন সুনীতা উইলিয়ামস-সহ চার মহাকাশচারী। ভোর সাড়ে তিনটে নাগাদ ফ্লরিডার সমুদ্রে তাঁদের নিয়ে অবতরণ করে ইলন মাস্কের মহাকাশযান স্পেসএক্স। মহাকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সুনীতাদের প্রত্যাবর্তন নিরাপদে হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা। আর ঘরের মেয়ে মহাজাগতিক মায়া কাটিয়ে পৃথিবীর মাটিতে পা রাখতেই অকাল দিওয়ালিতে মেতে উঠলেন সুনীতার পৈতৃক ভিটে ঝুলসানার বাসিন্দারা।
ঘরের মেয়ের পৃথিবীতে ফেরার মাহেন্দ্রক্ষণের সাক্ষী থাকতে মঙ্গলবার রাতে ঘুম ভুলেছিলেন ঝুলসানার বাসিন্দারা। স্থানীয় দেবী দোলা মাতার মন্দিরের সামনে জড়ো হয়েছিলেন সবাই। বিশেষ প্রার্থনায় সামিল হওয়ার পাশাপাশি অখণ্ড জ্যোতিও জ্বালিয়ে রেখেছিলেন। এক রাশ উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়েই মন্দির চত্বরে লাগানো বড় টিভির পর্দায় চোখ রেখেছিলেন তারা। অনেকেই দুরুদুরু বুক নিয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন। মনে হচ্ছিল ভারত-পাকিস্তানের টানটান ক্রিকেট ম্যাচ দেখছেন। সাড়ে তিনটে নাগাদ স্পেসএক্সের ড্রাগন ক্যাপসুল থেকে প্যারাসুটের মাধ্যমেই ফ্লরিডার সমুদ্রে অবতরণ করেন সুনীতারা। ওই স্প্ল্যাশডাউন নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হতেই জয়োল্লাসে চিৎকার করে উঠলেন ঝুলসানার বাসিন্দারা। জয়ের আনন্দে শুরু হল পটকাবাজি ফাটানো আর মিষ্টিমুখের পালা। সেই সঙ্গে চলল সুনীতার নামে জয়ধ্বনি। সুনীতার তুতো ভাই নবীন পাণ্ড্য আবেগ চাপতে না পেরে বললেন, ‘এই মুহুর্তের জন্য গত ৯ মাস ধরে অপেক্ষা করছি। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছি। গ্রামবাসীরা এদিন বিশেষ হোমযজ্ঞেরও আয়োজন করেছিলেন।’
উল্লেখ্য, গত বছরের ৫ জুন মহাকাশে পাড়ি দিয়েছিলেন সুনীতা উইলিয়ামস এবং বুচ উইলমোর। আট দিন পরেই তাঁদের পৃথিবীতে ফিরে আসার কথা ছিল।কিন্তু যে যানে চড়ে তাঁরা গিয়েছিলেন, সেই বোয়িং স্টারলাইনারে যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে। ফলে মহাকাশেই আটকে পড়েন দুজন। বেশ কয়েকবার সুনীতা ও বুচারকে ফেরানোর চেষ্টা করেছিল মার্কিন মহাকাশ বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থা নাসা। যদিও সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়। ফলে আট দিনের মহাকাশ সফর দীর্ঘায়িত হয় ৯ মাসে। ভারতীয় সময় মঙ্গলবার (১৮ মার্চ) সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) থেকে ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের মহাকাশযানে চেপে রওনা হন সুনীতা ও বুচ। তাদের সঙ্গে ছিলেন আরও দুই মহাকাশচারী নিক হেগ এবং আলেকজান্ডার গরবুনভ। মহাকাশ থেকে ২৮ হাজার কিলোমিটর বেগে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসতে থাকে স্পেসএক্স। যদিও পৃথিবী স্পর্শ করার আগে সাত মিনিটের জন্য ড্রাগন ক্যাপসুলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় নাসার স্পেস সেন্টারের।
দীর্ঘ ১৭ ঘন্টা যাত্রা শেষে স্থানীয় সময় মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ৫৭ মিনিটে (ভারতীয় সময় বুধবার ভোর সাড়ে ৩টে) পৃথিবী স্পর্শ করে স্পেসএক্সের মহাকাশযান। শেষ মুহুর্তে যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, তার জন্য আগেভাগেই খালি করে দেওয়া হয়েছিল ফ্লরিডা উপকূলবর্তী সামুদ্রিক এলাকা। নির্ধারিত সময়েই ফ্লরিডার উপকূলে গাল্ফ অফ মেক্সিকোতে প্যারাসুটের সাহায্যে স্প্ল্যাশডাউন করানো হয় মহাকাশচারীদের। ঠিক তার পরই একটি উদ্ধারকারী ভেসেলে তোলা হয় চার জনকে। পাড়ে ওঠার পর তাঁদের উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে। সেখানে ৪৫ দিনের জন্য রিহ্যাব প্রোগ্রাম চলবে সুনীতাদের।
নিরাপদে সুনীতাদের পৃথিবীতে ফেরার মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য রাত জেগেছিলেন বিশ্বের কোটি-কোটি মানুষ। অনেকেই বিভিন্ন টিভি চ্যানেল ও সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ স্ট্রিমিংয়ের দিকে চোখে রেখেছিলেন। রাত সোয়া দুটো (ভারতীয় সময়) নাসার ‘এক্স’ হ্যান্ডলে সুনীতাদের পৃথিবীতে ফেরার লাইভ কভারেজ শুরু হয়। প্রতি সেকেন্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে যাচ্ছিলেন দুই ধারাভাষ্যকার। রুদ্ধশ্বাসকর অবস্থায় প্রতীক্ষার প্রহর গুনতে শুরু করেন বিশ্ববাসী।