নিজস্ব প্রতিনিধি: ভারতের নানা রাজ্যের নানা স্থানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হল কলকাতার শ্যামবাজার। এই নামটি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন খ্যাতনামা সাহিত্যিকের রচনা থেকে শুরু করে শ্যামবাজারের শশী বাবু সকাল বেলা শসা খেয়ে’র মত হাস্যরসে উঠে এসেছে অগুনতিবার। কলকাতার উত্তরভাগে অবস্থিত শ্যামবাজার শুধুমাত্র একটি ব্যস্ত নগর কেন্দ্র নয়, এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শহরের উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। শ্যামবাজারের নামকরণ নিয়ে একাধিক মত প্রচলিত রয়েছে এবং এর প্রতিটিই নানা জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। এই অঞ্চলের ইতিহাস প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো, যার শিকড় পৌঁছে যায় সুতানুটি গ্রামের সময়ে।
শ্যামবাজার: সুতানুটি থেকে শহর
জানা যায়, শ্যামবাজার অঞ্চলের উৎপত্তি সুতানুটি গ্রামের অংশ হিসেবে, যা ছিল কলকাতার তিনটি প্রাচীন বসতির একটি (কলকাতা, সুতানুটি ও গোবিন্দপুর)। শ্যামবাজার ও আশেপাশের এলাকাগুলি ছিল মূলত বাঙালি অভিজাতদের বসতি — যেমন বাগবাজার ও শ্যামপুকুর। এই অঞ্চলে কোনও বড় রাস্তা বা নগর পরিকল্পনা ছিল না। প্রাথমিকভাবে একটি তীর্থপথ ছিল, যা পরবর্তীকালে চিৎপুর রোড (বর্তমানে রবীন্দ্র সরণি) হিসেবে গড়ে ওঠে। ধীরে ধীরে নগর উন্নয়নের মাধ্যমে শ্যামবাজার হয়ে ওঠে কলকাতার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।
প্রাচীন বাজার ও চার্লস বাজার
জন জেফানিয়া হলওয়েল, যিনি একজন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ছিলেন, তিনি এই বাজারটিকে “চার্লস বাজার” নামে অভিহিত করেন। সেই সময় কলকাতার উত্তরাংশে একাধিক স্থানীয় বাজার গড়ে উঠেছিল এবং শ্যামবাজার তার মধ্যে অন্যতম ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে “চার্লস বাজার” নামটি লোকমুখে বিলুপ্ত হয়ে যায়, এবং বর্তমানে আমরা যেটিকে “শ্যামবাজার” নামে চিনি, তার শিকড় রয়েছে এক বাঙালি ব্যবসায়ীর বিশ্বাস ও সংস্কৃতির ভিতরে।
শোভারাম বসাক ও শ্যামরায়
শ্যামবাজার নামকরণের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত অনুযায়ী, এই অঞ্চলের নাম এসেছে শ্যামরায় অর্থাৎ ভগবান কৃষ্ণ-এর নাম থেকে। শোভারাম বসাক, যিনি অষ্টাদশ শতকের একজন বিশিষ্ট ধনী বাঙালি ব্যবসায়ী ছিলেন এবং সুতানুটির আদি বাসিন্দাদের মধ্যে একজন, তার গৃহদেবতা ছিলেন শ্যামরায়। তিনি তাঁর বসবাসের ও বাজার পরিচালনার এলাকাটিকে তাঁর গৃহদেবতার নামে “শ্যামবাজার” নামকরণ করেন। বসাক ও শেঠ পরিবার ছিল কলকাতার আদিগ্রামী ব্যবসায়িক শ্রেণির অংশ, যারা সুতানুটিকে বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছিল। তাদের মাধ্যমে ধর্মীয় সংস্কৃতি ও নগর পরিকল্পনার এক মিশ্র রূপ সৃষ্টি হয়।
অন্যান্য জনশ্রুতি
শ্যামবাজার নামকরণ নিয়ে আরও কিছু জনশ্রুতি রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, নামটি এসেছে শ্যামাচরণ মুখোপাধ্যায় অথবা শ্যামাচরণ বল্লভ নামে জমিদার বা প্রভাবশালী ব্যক্তিত্বের নামে। অনেকের মতে, সেই সময় “বড় বাজার”-এর অনুকরণে এই অঞ্চল পরিচিত হয়ে ওঠে “শ্যামাচরণবাবুর বাজার” নামে। পরে সংক্ষেপে তা “শ্যামবাজার” হয়ে যায়।
তবে এই মতগুলি নির্দিষ্ট প্রমাণের অভাবে অনুমানভিত্তিক রয়ে গিয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হলো, শোভারাম বসাক ও তাঁর শ্যামরায় ভক্তির সূত্রধরেই এই নামকরণ হয়েছিল।
পাঁচমাথার মোড় ও নগর উন্নয়ন
শ্যামবাজারের আজকের পরিচিতি গড়ে উঠেছে তার পাঁচমাথার মোড় ও নগর পরিবহন ব্যবস্থার কেন্দ্রস্থল হিসেবে। উনবিংশ শতকে লটারি কমিশনের উদ্যোগে শহরের রাস্তা নির্মাণ শুরু হয় এবং সেই সময়েই শ্যামবাজারে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা এসে মিলিত হয়:
- চিৎপুর রোড (রবীন্দ্র সরণি)
- বিধান সরণি (প্রাক্তন কর্নওয়ালিস স্ট্রিট)
- ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোড
- আর. জি. কর রোড
- ভূপেন বসু অ্যাভিনিউ (সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ-এর উত্তরাংশ)
এই পাঁচটি রাস্তা মিলে গড়ে তোলে আজকের “শ্যামবাজার পাঁচমাথা” — যা সারা বাংলা তথা ভারতের অন্যতম বিখ্যাত এবং ব্যস্ততম মোড়।
গণপরিবহন ও আধুনিক শ্যামবাজার
১৮৮২ সালে শ্যামবাজারে ঘোড়ায় টানা ট্রাম চালু হয় এবং পরবর্তী দশকে এটি বিদ্যুৎচালিত ট্রামে রূপান্তরিত হয়। ১৯৪১ সালে সার্কুলার রোডে ট্রাম চালু হয় এবং ট্রামই বহু বছর শহরের প্রধান গণপরিবহন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এখানকার শ্যামবাজার ট্রামডিপো এবং মেট্রো স্টেশন অঞ্চলটির যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করে। ১৩ অগস্ট ১৯৯৪ সালে শ্যামবাজার মেট্রো স্টেশন চালু হয় এবং ধীরে ধীরে এটি দমদম থেকে মহানায়ক উত্তম কুমার পর্যন্ত বিস্তৃত মেট্রো রুটের অংশ হয়ে ওঠে।
শ্যামবাজারে নেতাজির মূর্তি
শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে অবস্থিত নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ১৫.১ ফুট উঁচু এই ঘোড়সওয়ার ব্রোঞ্জের মূর্তিটি উত্তর কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ল্যান্ডমার্ক। ১৯৬৯ সালে কলকাতা পৌরসংস্থা এই মূর্তিটি স্থাপন করে। এটি নির্মাণ করেন ভাস্কর নাগেশ যোগলেকর, যিনি ১৮৬১ সালে পার্ক স্ট্রিটে স্থাপিত লর্ড আউট্রামের ঘোড়সওয়ার মূর্তি থেকে অনুপ্রাণিত হন। মূর্তিটিতে নেতাজিকে সামরিক পোশাকে এক পা তোলা ঘোড়ার পিঠে দৃপ্ত ভঙ্গিতে বসে থাকতে দেখা যায়, যা তাঁর সংগ্রামী মনোভাব ও নেতৃত্বগুণের প্রতীক। ২০০৮ সালে হুগলি রিভার ব্রিজ কমিশনার্স (HRBC) এই মূর্তির সৌন্দর্যায়নের কাজ শুরু করে। এই মূর্তিটি শুধু ঐতিহাসিক নয়, এটি একটি দিকনির্দেশক চিহ্নও—যা পথচলতি মানুষের কাছে শহরের গর্বের প্রতীক।
শ্যামবাজার নামকরণ শুধুমাত্র একটি বাজার বা স্থাননামের উৎপত্তি নয়, এটি ধর্ম, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং শহরের ইতিহাসের এক সমন্বয়। শোভারাম বসাকের শ্যামরায় ভক্তি থেকে শুরু করে ব্রিটিশ আমলের নগর উন্নয়ন পর্যন্ত—শ্যামবাজার এক পরিবর্তমান ইতিহাসের প্রতিচ্ছবি। আজও এই নামের পেছনের কাহিনিগুলি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, কিভাবে একটি এলাকা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহরের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়।