নিজস্ব প্রতিনিধি: সুপ্রিম কোর্টের(Supreme Court) প্রধান বিচারপতি(Chief Justice of India) ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের(D Y Chandrachur) নেতৃত্বাধীন ৯ সদস্যের বেঞ্চ বৃহস্পতিবার এক ঐতিহাসিক রায়(Historical Verdict) প্রদান করে দেশের রাজ্যগুলির হাতে এক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা তথা অধিকার তুলে দিল। দেশের খনিজ সম্পদ কেন্দ্রের সম্পদ হিসাবেই এতদিন চিহ্নিত হতো। আর সেই কারণেই কয়লা, লৌহ আকরিক-সহ যাবতীয় খনিজ সম্পদ থেকে কেন্দ্র সরকার একতরফা ভাবে রয়্যালটি বাবদ আয় করতো। অথচ যে রাজ্য যে থেকে সেই সব সম্পদ উত্তোলিত হতো সেই রাজ্যের সরকার এই রয়্যালটির কোনও অধিকার ভোগ করত না। যদিও কয়েক যুগ ধরে বাংলা, বিহার, ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্রের মতো রাজ্যগুলি খনিজ সম্পদের ওপর রয়ালটি চাপানো এবং সেই বাবদ উপার্জিত অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চাপ দিয়ে আসছিল। এদিন সেখানেই দিশা দিয়ে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার এক ঐতিহাসিক রায়ে দেশের শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিয়েছে, কয়লা, লৌহ আকরিক-সহ যাবতীয় খনিজ সম্পদ থেকে রয়্যালটি বাবদ আয়(State’s Right to Royalty on Mineral Resources) করতে পারবে রাজ্যগুলি।
এদিন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বাধীন ৯ সদস্যের বেঞ্চ জানিয়েছে, আইনের চোখে রয়্যালটি হল জমির মালিকের সঙ্গে ব্যবহারকারীর এক ধরনের বোঝাপড়া বা চুক্তি। তা নির্দিষ্ট মেয়াদের লিজও হতে পারে। যেহেতু ভারতে জমির প্রকৃত মালিক রাষ্ট্র তাই রয়্যালটি চাপানোর এক তরফা অধিকার শুধু কেন্দ্র ভোগ করে আসছিল। খনি ও খনিজ উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ আইন(MMDR) কর সংগ্রহের জন্য রাজ্যগুলির ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে না। খনিজ ও খনি জমির ওপর কর আদায়ের সম্পূর্ণ অধিকার রাজ্যগুলির রয়েছে। সংবিধানের দ্বিতীয় তালিকায় ৫০ নম্বর এন্ট্রি অনুযায়ী খনিজ সম্পদ সম্পর্কিত কোনও সিদ্ধান্ত সংসদের নেই। শীর্ষ আদালত আভাস দিয়েছে, এতদিন কেন্দ্র রয়্যালটি বাবদ যে অর্থ উপার্জন করেছে তার ভাগ রাজ্যগুলিকে দিতে হবে কি না সে বিষয়ে আগামী বুধবার তাঁরা রায়ের বাকি অংশ শোনাবেন। তবে সুপ্রিম কোর্ট এটাও জানিয়ে দিয়েছে, এবার থেকে খনিজ সম্পদ থেকে প্রাপ্ত রয়্যালটিকে কর বা ট্যাক্স বলে গন্য করা যাবে না।
খনিজ সম্পদের উপর রয়ালটি চাপানো এবং সেই বাবদ উপার্জিত অর্থের ভাগাভাগি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজ্যগুলির সঙ্গে কেন্দ্রের বিবাদ আছে। এই বিবাদে অগ্রগণ্য ভূমিকা ছিল বাংলার। বামফ্রন্ট সরকারের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশাসনও কেন্দ্র-রাজ্য আলোচনায় এই প্রসঙ্গ তুলে রয়্যালটি খাতে প্রাপ্ত অর্থের ভাগ দাবি করে আসছিল। আসানসোল, রানিগঞ্জ এলাকা ছাড়াও বাঁকুড়া, বীরভূম, পুরুলিয়ার বিভিন্ন খনি থেকে তোলা খনিজ সম্পদ থেকে রাজ্য সরকারের আয়ের কোনও সুযোগই ছিল না। সুপ্রিম কোর্টের ১৯৯৭ সালের একটি রায় এই ব্যাপারে রাজ্যগুলির জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল। বৃহস্পতিবার শীর্ষ আদালত সুপ্রিম কোর্টের এই সংক্রান্ত পুরনো রায়গুলি খারিজ করে দিয়ে রাজ্যগুলির অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। এরফলে রাজ্য সরকারগুলি রাজস্ব বাবদ বিপুল অর্থ উপার্জনের রাস্তা খুলে গেল। শীর্ষ আদালতের রায়ে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে ওডিশা, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তীসগড় এবং পশ্চিমবঙ্গ(West Bengal)। আগে আদায় করা অর্থের ভাগ রাজ্যগুলি পেলে বিপুল অর্থ তাদের হাতে আসবে। রাজ্যের রাজস্ব আদায়ও বেড়ে যাবে। রাজ্য সরকারগুলি প্রকল্প খাতে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারবে।
এক্ষেত্রে বাংলার লাভ সব থেকে বেশি হতে চলেছে বীরভূম জেলার ঢেউচা-পাঁচামি(Deucha Pnachami) থেকে। কেননা ঢেউচা-পাঁচামিতে কয়লার ৪টি জোন রয়েছে। তাতে ২০২৬ মিলিয়ন টন তথা ২০২.৬ কোটি টন কয়লা মজুত রয়েছে। সেই কয়লা উত্তোলিত হতে শুরু করলে সেখান থেকে রাজস্ব বাবদবিপুল আয় হতে চলেছে নবান্নের। প্রাথমিক ভাবে হিসাব ছিল রাজ্য সরকার ডেউচা-পাঁচামি থেকে মাসে ২০০ কোটি টাকা আয় করতে পারে। সেটাই সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে এক ধাক্কায় ৫০০ কোটিতে পৌঁছাতে পারে বলে নবান্নের আধিকারিকদের ধারনা। এর পাশে তো পশ্চিম বর্ধমান, পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও বীরভূম জেলার কয়লা খনিগুলি। সেখান থেকে এতদিন কোনও কর আদায় করতে পারতো না রাজ্য সরকার। এদিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে সেই দরজা খুলে গেল। ফলে আগামী দিনে রাজ্য সরকারের আয় যে বিপুল ভাবে বাড়তে চলেছে এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।