পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : চাকরির মন্দা আজকালকার নতুন বিষয় না। এর শিকার হতে হয়েছিল বিশ্ববরেণ্য সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দেকেও। একসময় কলকাতার রাস্তায় হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন যুবক বিবেকানন্দ। সময়টা ছিল ১৮৮৪ সাল। তখনও তিনি ‘বিবেকানন্দ’ হননি। ক্লান্ত উজ্জ্বল মুখে নরেন্দ্রনাথ শহরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ছুঁটে বেড়িয়েছিলেন চাকরির আশায়। জানা যায়, স্বামীজীর বাবা বিশ্বনাথ দত্ত বেঁচে থাকতে স্বামীজীকে সাংসারিক ধাক্কা পোহাতে হয়নি। ওকালতি করায় গোটা সংসার অবিলম্বে সামলে নিতেন বিশ্বনাথ। তবে বাবা মারা যাওয়ার পরেই সাংসারিক ঝড় এসেছিল নরেন্দ্রর জীবনে। উত্তর কলকাতার সিমলা পাড়ার বাড়িটা নিয়ে আত্মীয় পরিজনরা গোলযোগ বাঁধিয়েছিল। এছাড়াও দত্ত পরিবার তখন ঋণে জর্জরিত। সংসারে মা ভুবনেশ্বরী ছাড়াও আরও দুই ভাই মহেন্দ্রনাথ ও ভূপেন্দ্রনাথ ছিলেন। বাধ্য হয়েই চাকরির খোঁজে রাস্তায় নামতে হয়েছিল নরেন্দ্রনাথকে। ‘স্বামী বিবেকানন্দ’ হওয়ার আগেই দুঃখ, মৃত্যু, বেকারত্ব গ্রাস করেছিল তাঁর জীবনকে। আর, স্বাভাবিকভাবেই জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার লড়াই তাঁকেও অনিশ্চিতের মুখে ফেলেছিল।
এরপর হঠাৎই নরেন্দ্রকে নিজের বাড়ি ছেড়ে ভাড়া বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়। জানা যায়, বিশ্বনাথ দত্তের এক কাকা সিমলার বাড়ি নিয়ে মামলা করে দিয়েছিলেন। তাই তখন একটা চাকরি না হলেই নয়। কিন্তু, সে সময়ের কলকাতায়ও একটি সাধারণ চাকরি জোগাড় করা ছিল দুঃসহ ব্যাপার। সমস্ত অফিসে আবেদনপত্র নিয়ে যাচ্ছেন, আর খালি হাতে ফিরে আসছেন নরেন্দ্রনাথ। শেষমেশ একটি কাজ জুটল। ‘শ্রীম’ মহেন্দ্রনাথ গুপ্তর চেষ্টায় সুকিয়া স্ট্রিটের মেট্রোপলিটন স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি পেয়েছিলেন যুবক নরেন। স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। তবে নরেন্দ্র বেশিদিন চাকরি করতে পারেননি এখানে। শোনা যায়, বিদ্যাসাগরের জামাই সূর্যকুমার অধিকারী ছিলেন এই বিদ্যালয়ের সেক্রেটারি। সমস্ত শিক্ষক, হেড মাস্টার সবাই তাঁকে সমঝে চলবে, তাঁর কথা শুনবে, এই সূর্যকুমারের অভিপ্রায়। কিন্তু নরেন যে অন্য ধাতুতে গড়া মানুষ। তাঁর পড়ানোর আদব কায়দা সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। তাই বিনা কারণেই একপ্রকার সাজিয়ে ছাত্রদের মারফত বিদ্যাসাগরের কাছে খবর পাঠানো হয়েছিল— ‘নতুন মাস্টার পড়াতে পারেন না।’ ওদিকে বিদ্যাসাগর মহাশয় তখন অসুস্থ। নিজের সমস্যায় নিজেই জর্জরিত। ভালোভাবে খোঁজও নিলেন না, এই অভিযোগের সত্যতা নিয়ে। তাই বিদ্যাসাগর বলে বসলেন, ‘তাহলে নরেন্দ্রনাথ আর যেন না আসে’…
এমনও জানা যায়, নরেন্দ্রনাথ স্কুলে এসে পড়াশোনার পাশাপাশি পড়ুয়াদের গানবাজনা শেখা ও খেলাধুলো করারও উৎসাহ দিতেন। যা মোটেই ভালভাবে নেননি সূর্যকুমার। ফলে অচিরেই তিনি শ্বশুরমশাইয়ের কানভারী করেছিলেন। তবে সেদিন নরেন্দ্রনাথকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করাই নরেন্দ্রর জীবনের মোর ঘুরিয়েছিল। বলে রাখা ভালো, যে, এই ঘটনার কিছু পূর্বেই ১৮৮১ সালের নভেম্বর মাস নাগাদ সুরেন্দ্রনাথ মিত্রের বাড়িতে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল নরেনের। তাই নিঃসন্দেহে এই চাকরি থেকে বরখাস্ত হওয়াই তাঁকে নরেন্দ্রনাথ থেকে স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।