নিজস্ব প্রতিনিধি: নজরে আগামী বছরের বিধানসভা ভোট। তার প্রস্তুতিতে ধর্মীয় মেরুকরণে শান দিতে আজ রবিবার রামনবমীতে শক্তি প্রদর্শনে কোমর কষে ঝাঁপাচ্ছে গেরুয়া শিবির। কলকাতা-সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলাপয় ছোট-বড় মিলিয়ে সহস্রাধিক শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। ওই শোভাযাত্রায় বিজেপি নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি থাকছে কট্টর হিন্দুত্ববাদের প্রবক্তা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ সহ পদ্ম শিবিরের ‘মেন্টর’ হিসাবে পরিচিত আরও একাধিক ধর্মীয় সংগঠন। নানা নাম দিয়ে রাতারাতি বিভিন্ন সংগঠন ও ধমীয় মঞ্চ গড়ে আসরে নেমেছে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্রে পরিণত করার স্বপ্ন দেখা ধর্মের কারবারিরা।
রামনবমী ঘিরে আয়োজিত শোভাযাত্রা নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে রাজনৈতিক পারদ তুঙ্গে উঠেছে। কড়া নজর রেখে চলেছে রাজ্য প্রশাসন। বলা যেতে পারে বাজপাখির মতো নজর। শোভাযাত্রা ঘিরে যাতে অশান্ত না হয়ে ওঠে রাজ্য তার জন্য ইতিমধ্যেই একাধিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে শুরু করে কলকাতা পুলিশের কমিশনার মনোজ ভার্মা বার বার দাঙ্গাবাজদের সতর্ক করে দিয়েছেন। গত কয়েক বছর রিষড়া-হাওড়া-শক্তিপুর সহ যে সব সংবেদনশীল জায়গায় রামনবমীর শোভাযাত্রা ঘিরে অশান্তি হয়েছে, সেখানে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কলকাতা শহরেই ২০৩টির মতো পুলিশ পিকেট বসানো হয়েছে। শীর্ষ কর্তাদের ঠান্ডিঘর ছেড়ে রাস্তায় নামার নির্দেশ দিয়েছেন পুলিশ মন্ত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজ্য পুলিশের ২৯ দুঁদে আইপিএস অফিসারকে সংবেদনশীল এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলার পুলিশকে পইপই করে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, মিছিলে অকারণে বাধার সৃষ্টি করে গেরুয়া শিবিরকে যেন অশান্তি পাকানোর কোনও মওকা দেওয়া হয়। গত কয়েক বছর ধরে হিন্দু ভোট ব্যাঙ্ক শক্তিশালী করতে ‘রাম-জী ভরসা’ বলে আসরে নেমেছে হিন্দুত্ববাদীরা। যদিও খুব একটা কল্কে পায়নি। বাংলার সিংহভাগ হিন্দুই ধর্মীয় মেরুকরণের তীব্র বিরোধী। ফলে ভগবানের নাম করে নগ্নভাবে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার ফাঁদে পা দেননি।
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, রাজ্যে গত কয়ক বছর ধরেই কট্টর হিন্দুত্বের এক চোরাস্রোত বইছে। বিশেষ করে কলকাতার উপকণ্ঠে অবাঙালি অধ্যুষিত এলাকাতে ক্রমশই পদ্ম প্রস্ফুটিত হচ্ছে। তৃণমূল বিরোধী এবং সাম্প্রদায়িক শক্তির দোসর বাজারি সংবাদমাধ্যমগুলোও গেরুয়া শিবিরের হয়ে ‘হিন্দুত্বের’ পক্ষে জোয়ার আনার চেষ্টা চালাচ্ছে। ফলে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা উৎসাহিত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গত অগস্টে শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতা থেকে উৎখাত হওয়ার পরে বাংলাদেশে হিন্দুদের উপরে বেলাগাম নির্যাতন এপার বাংলায় অনেকটাই প্রভাব ফেলেছে। সেই প্রভাব ভোট বাক্সে প্রতিফলিত করাতে চাইছেন হিন্দু ধর্মের কারবারি তথা নেতারা।
রামনবমী ঘিরে গত কয়েকদিন ধরে গেরুয়া শিবির বাতাসে ধর্মীয় বিষ ঢেলে চলেছে বলে অভিযোগ। গল্পের গরুকে যেমন গাছে চড়ানো হয়, তেমনই প্রধানমন্ত্রীকে চিটি লিখে কেউ-কেউ তো আবার শোভাযাত্রায় জঙ্গিরা হামলা চালাতে বলে আগাম নালিশ ঠুকেছেন। তবে এটা ঠিক যে বিভিন্ন জেলা থেকে গোয়েন্দারা যে রিপোর্ট পাঠিয়েছেন ভবানী ভবনে তাও যথেষ্ট উদ্বেগজনক। যদিও বিশ্ব হিন্দু পরিষদ থেকে শুরু করে বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব বার বার বলছেন, রামনবমীতে অশান্তি সৃষ্টি করা তাদের উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে যেভাবে পদ্ম নেতারা গরম-গরম ভাষণ দিচ্ছেন, তা অশান্তির আগুন জ্বালাতে যথেষ্ট বলে মনে করছেন দুঁদে পুলিশ আধিকারিকরা। তাই এবার বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ মহল। হাওড়া গ্রামীণ, হাওড়া শহর, আসানসোল, শিলিগুড়ি-সহ কয়েকটি জায়গায় বিশেষ নজর রাখার জন্য ২৯ জন আইপিএস অফিসারকে নিয়ে বিশেষ টিম তৈরি করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যাতে অবনতি না হয়, তার জন্য রবিবার ছুটির দিন হলেও নবান্নে পুলিশের শীর্ষ আধিকারিকরা থাকবেন। সেখান থেকে পরিস্থিতির উপর নজর রাখবেন। শনিবার থেকেই সংবেদনশীল এলাকায় পুলিশের ফ্ল্যাগমার্চ-অতিরিক্ত টহলদারি নজরে পড়েছে সাধারণ মানুষের। আকাশপথেও নজরদারি চালানো হচ্ছে। হাওড়ার সাঁকরাইল-সহ বিভিন্ন জায়গায় অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা গিয়েছে।
প্রবীণ পুলিশ আধিকারিক থেকে শুরু করে পোড়খাওয়া রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, রবিবার রামনবমী মূলত গেরুয়া শিবিরের সঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য প্রশাসনের এক অঘোষিত স্নায়ুযুদ্ধ। ওই যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত কে শেষ হাসি হাসবেন, তা দেখতে অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা ছাড়া আর কিছু করণীয় নেই।