পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায়: নাম নয়, অর্থ নয়, প্রতিপত্তি নয়, যশ নয়, খ্যাতিও নয়, সেদিন পরমহংস শ্রী রামকৃষ্ণ সকলকে চৈতন্য দিয়েছিলেন। সেই দিনটি ছিল ১৮৮৬ সালের ১ জানুয়ারি, যেদিন তিনি কল্পতরু হয়েছিলেন। তবে জানেন কী, কী এই কল্পতরু? কেনই বা এই দিন ঠাকুর নিজের অবতার রূপ প্রকাশ করেছিলেন?
প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে কল্পতরু হল স্বর্গের একটি বিশেষ বৃক্ষ। যার কাছে ভাল বা মন্দ – যা চাওয়া হয়, তাই মেলে। আক্ষরিক অর্থ অনুযায়ী কল্প কথার অর্থ ইচ্ছে, ও তরু শব্দের অর্থ বৃক্ষ; অর্থাৎ যে গাছ মানুষের ইচ্ছেকে পূর্ণ করে সেই হল কল্পতরু। স্বামী ব্রহ্মানন্দের কথায়, “দেবত্ব চাইলে দেবত্ব, পশুত্ব চাইলে পশুত্ব।” পুরাণে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, স্বর্গের নন্দনকাননে পারিজাত বৃক্ষ নামে একটি বৃক্ষের উল্লেখ পাওয়া যায়, যা কল্পতরু গাছ বলে পরিচিত। কথিত আছে, সমুদ্র মন্থনকালে অমৃত, লক্ষ্মীদেবী, ঐরাবত, কৌস্তুভ মুনি ছাড়াও উঠে এসেছিল এই বৃক্ষটিও। যা পরবর্তীতে দেবরাজ ইন্দ্রের বিখ্যাত নন্দনকাননের শোভা বর্ধন করেছিল, এমনটাই জানা যায়। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে দেবরাজ ইন্দ্রের নন্দনকানন থেকে এই গাছ শ্রীকৃষ্ণ তাঁর পত্নী সত্যভামার মন রাখতে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নিয়ে এসেছিলেন।
জানা যায়, ১৮৮৬ সালের ১ জানুয়ারি রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব তাঁর ভক্তদের বলেছিলেন, “তোমাদের চৈতন্য হোক।” সেই সময় গলার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ শ্রীরামকৃষ্ণদেব। চিকিত্সার জন্য তাঁকে উত্তর কলকাতার কাশীপুরে একটি বাগানবাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এই বিশেষ দিনে তিনি একটু সাময়িক সুস্থ বোধ করায় বাগানে হাঁটতে বের হয়েছিলেন। সেই সময় সমাধিস্থ হয়ে সেখানে উপস্থিত তাঁর সব ভক্তদের তিনি স্পর্শ করেন। সেই সব ভক্তরা পরবর্তীকালে জানিয়েছিলেন যে তাঁদের প্রত্যেকেরই সেদিন অদ্ভুত কিছু আধ্যাত্মিক অনুভূতি হয়েছিল। কাশীপুরের উদ্যানবাটীতেই জীবনের শেষ কয়েকটা দিন কাটিয়েছিলেন রামকৃষ্ণ। তাঁকে স্বয়ং নারায়ণের অবতার বলে মনে করতেন তাঁর ভক্তরা। এই দিনেই রামকৃষ্ণদেব তাঁর অবতার রূপ প্রকাশ করেছিলেন বলে প্রচলিত বিশ্বাস। এদিন তাঁর কাছে যে ভক্তরা যা প্রার্থনা করেছিলেন, তিনি সকল মনোবাসনা পূরণ করেছিলেন। এর কিছু মাস পরেই মহাসমাধিতে নিমগ্ন হন পরমহংস শ্রীরামকৃষ্ণ। এরপর থেকেই প্রতি বছর ১ জানুয়ারি দিন কল্পতরু দিবস বা কল্পতরু উত্সব হিসেবে পালন করা হয়।
প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী, প্রতি বছর ১ জানুয়ারি কল্পতরু দিবস বা কল্পতরু উত্সব পালিত হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের ও বিবেকানন্দের ভক্তরা এই বিশেষ দিনটি যাবতীয় নিয়ম আচার মেনে পালন করে থাকেন। কাশীপুর উদ্যানবাটী, দক্ষিণেশ্বর কালীবাড়ি এবং বেলুড় মঠে প্রতি বছর ১ জানুয়ারি লক্ষাধিক ভক্তের ভিড় উপচে পড়ে। এই বিশেষ দিনে শ্রী রামকৃষ্ণ’কে স্মরণ করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে নতুন বছর শুরু করে অগণিত ভক্তবৃন্দ।
কল্পতরু সম্পর্কে পুরাণে একটি গল্পের উল্লেখ আছে। একদা পথশ্রমে ক্লান্ত এক ব্যক্তি একটি গাছের নীচে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। গাছটি যে কল্পতরু তা তিনি জানতেন না। হঠাৎ তিনি ভাবলেন, ‘‘খুব তেষ্টা পেয়েছে, একটু যদি জল পেতাম তো খুব ভাল হত।’’ ও বাবা, ভাবনা শেষ হতে না হতেই নানা রকম জল এসে হাজির। এ বার তার মনে হল, ‘‘একটু খাবার পেলে বেশ ভাল হত।’’ অমনি নানা সুস্বাদু সব খাবার চলে এল। বিশ্রামের কথা ভাবতেই অমনি প্রস্তুত হয়ে গেল সুরম্য বিশ্রামাগার। এ বার তিনি ভাবলেন, ‘‘যদি কেউ একটু পা টিপে দিত, ঘুমটি বেশ ভালোই হত।’’ এক সুন্দরী মহিলা অমনি উপস্থিত। হঠাৎ তাঁর মনে হল, ‘‘এত সুখ আমার কপালে সইবে তো? হঠাৎ যদি বাঘ এসে হাজির হয়!’’ ভাবা মাত্র বাঘ এসে হাজির হয়ে লোকটিকে খেয়ে ফেলল।
এই রূপক গল্পটির অন্তরালে যে রূপটি রয়েছে তা হল, চাইতে জানতে হয়। কল্পতরু কল্পনারই গাছ। কিন্তু সে যদি বাস্তব হত, তবে কী চাইতাম তার কাছে? মানুষের মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকা আকাঙ্ক্ষা কখনোই পরিপূর্ণ তৃপ্তি দেয় না। তাই এমনই চাইতে হবে, অর্থাৎ, সেই সত্যের খোঁজ করতে হবে – যা চিরস্থায়ী, যা অনন্তস্পর্শী।