পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায়: প্রচলিত রয়েছে, সরস্বতী পুজোর দিনে বই নিয়ে বসলে নাকি দেবী রুষ্ট হন। আবার অনেক শিশুদের এই দিনেই হাতেখড়ি হয়ে থাকে। এই একটা বিষয় বরাবরেরই দ্বন্দ্বের। আবার একটু যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করলেই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, লেখাপড়া বা গান-বাজনা করা যে দেবীর পছন্দের বিষয়, তবে তাঁর পুজোর দিন কীভাবে অধ্যয়ন নিষিদ্ধ হয়? অথচ পৌরাণিক কাহিনী মতে তাঁর এহেন সংহার রূপের বর্ণনা নেই বললেই চলে।
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, মা সরস্বতীর বরেই দস্যু রত্নাকরের মুখ থেকে নিঃসৃত হয়েছিল সেই বিখ্যাত শ্লোক, “মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ত্বমগমঃ শাশ্বতীঃ সমাঃ। যৎ ক্রৌঞ্চমিথুনাদেকমবধীঃ কামমোহিতম্।” এরপরেই সেই রত্নাকর হয়ে উঠেছিলেন মহামুনি বাল্মীকি। অন্যদিকে চরম মূর্খ কালিদাস দেবী সরস্বতীরই কৃপাধন্য হয়েই মহাজ্ঞানী মহাকবি কালিদাসে পরিণত হয়েছিলেন। যে দেবীর শরীরে এমন দয়া-মায়া, তিনি তাঁর পুজোর দিন পড়তে বসলেই বিদ্যা কেড়ে নেবেন, এমনটাও কী মানা সম্ভব ?
সেক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে, বেশিরভাগই শাস্ত্রের নামে যা বলা হয়, তা হবহু শাস্ত্রের বর্ণনার সঙ্গে মেলে না। এক্ষেত্রেও খানিকটা তেমনই হয়েছে। তাই সরস্বতী পুজোর দিন অধ্যয়ন নিষিদ্ধ একথা যেমন ভুল নয়, তেমনই এদিন লেখাপড়া করলে দেবী রুষ্ট হবেন সে কথাও সত্যি নয়। তাই আসল ব্যাপারটার সঠিক যুক্তিসম্মত ব্যাখ্যা পেতে হলে একটু শাস্ত্রে বর্ণিত সরস্বতী পুজোর কিছু বিধির দিকে নজর দিতে হবে। জানা যায়, যে কোনও মূর্তি পুজোর ক্ষেত্রেই মূল প্রতিমার সঙ্গে থাকা যাবতীয় অনুষঙ্গের পুজো করতে হয়। ঠিক যেমন দুর্গাপুজোর ক্ষেত্রে দেবীর বাহন সিংহ, দশ রকমের অস্ত্র, মহিষ, এমনকি মহিষাসুরেরও আলাদা ভাবে পুজো করতে হয়। তেমনই ষড়োশপচারে পুজো করার পর সরস্বতী মূর্তির সঙ্গে থাকা অনুষঙ্গেরও আলাদা আলাদা ভাবে মন্ত্র পড়ে পুজো করা হয়।
বলা বাহুল্য, সরস্বতী মূর্তির মতোই এই অনুষঙ্গগুলিকেও ব্রহ্মজ্ঞানেই পুজো করতে হয়। যার মধ্যে প্রথমেই আসে দেবীর বাহন হংস। এরপর আসে ‘নাদ’ যা ইঙ্গিত করে যে বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্রকে। একইভাবে ব্রহ্মজ্ঞানে পুজো হয় দোয়াত, কলম, পুস্তক, রং-তুলি ইত্যাদিরও। শাস্ত্রমতে এই সমস্ত অনুষঙ্গের পুজো করার আগে অন্তর থেকে এঁদের মধ্যে ব্রহ্মস্থাপন করতে হয়। এরপর বিভিন্ন উপাচারে দেবীর মতো এঁদেরকেও পুজো করা হয়।
এবারে জানিয়ে রাখা ভালো, শাস্ত্রমতে মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলে পূজারি ব্যতীত অন্য কারও তা স্পর্শ করার অধিকার থাকে না। তাই, যতক্ষণ না তার পরের দিন ঘট বিসর্জন হচ্ছে, তার আগে পর্যন্ত মূর্তিতে হাত দেওয়াও উচিত নয়। এই জন্যই শাস্ত্রানুসারে বিসর্জনের আগে পর্যন্ত বিদ্যাচর্চার সঙ্গে জড়িত যে কোনও জিনিসকে ব্যবহার করতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তবে, সরস্বতী পুজোর পরেরদিন যদি কারও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা থাকে, তাহলে তার অবশ্যই পড়তে বসা উচিত। না হলে হাজার পুজো করলেও বিদ্যাদেবী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার বর দেবেন না। অন্য দিকে আবার, নতুন বিদ্যার্থীদের হাতেখড়ির জন্য একটা শুভ দিনের প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে বিদ্যার দেবী সরস্বতীর পুজোর দিনই যথোপযুক্ত। তাই অনেক ক্ষেত্রে, দেবী সরস্বতীর সামনেই ‘হাতেখড়ির’ আয়োজন করা হয়। তাই, নির্দ্বিধায় বলা যায়, শাস্ত্র মেনেই হোক, বা না মেনে, মনে রাখতে হবে, বাগদেবী তাদের উপরই সদা প্রসন্ন হন, যারা বিদ্যার অনুশীলন করেন, বিদ্যাকে শ্রদ্ধা করেন ও ভালোবাসেন। সেটাই বাগদেবী সরস্বতীর প্রকৃত পুজো।