পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : “ওঁ বক্র তুন্ড মহাকায়ং সূর্য কোটি সমপ্রভ, নির্বিঘ্নং কুরুমে দেব সর্ব কার্যেসু সর্বদা“
গণপতি অর্থাৎ গণের নেতা । তিনি বিঘ্ননাশক। তিনি হলেন হিন্দুধর্মের অন্যতম পরিচিত ও সর্বাধিক পূজিত দেবতাদের মধ্যে অন্যতম। তিনি গণেশ, বিঘ্নেশ্বর, বিনায়ক, গজপতি, গজানন, একদন্ত ইত্যাদি নামেও পরিচিত। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়ার জাভা ও বালি, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, বাংলাদেশ, ফিজি, গায়ানা, মরিশাস এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগো সহ বৃহৎ জাতিগত ভারতীয় জনসংখ্যার দেশগুলিতে গণেশ পূজা ব্যাপকভাবে প্রচলিত । তবে জানেন কি? গণেশের আবির্ভাব কি ভাবে হয়েছিল ?
জানা যায়, পৌরাণিক কাহিনী মতে গণেশের আবির্ভাবের একাধিক ব্যাখ্যা আছে। তবে শিবপুরাণে বর্ণিত ব্যাখ্যাটির গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি। শিবপুরাণে বর্ণিত কাহিনী অনুসারে জানা যায়, একদা মাতা পার্বতী নন্দীকে দ্বাররক্ষী নিযুক্ত করে স্নান করতে যান। এমন সময় শিব সেখানে উপস্থিত হলে, তিনি নন্দীকে তিরস্কার করে পার্বতীর স্নানাগারে প্রবেশ করেন। এতে পার্বতী অপমানিত ও ক্ষুব্ধ হন। অবশেষে সখী জয়া ও বিজয়ার সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি মাটি দিয়ে সুন্দর পুত্রের মূর্তি নির্মাণ করেন ও সেই মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করে তাঁকে নিজের বিশ্বস্ত অনুচর নিয়োগ করেন। এরপর একদিন এই পুত্রকে দ্বাররক্ষী নিয়োগ করে পার্বতী স্নানে গেলে শিব সেখানে উপস্থিত হন। সেই কুমার শিবকে যেতে বাধা দেন। এতে প্রথমে প্রমথগণের সঙ্গে তার বিবাদ ও পরে পার্বতীর ইঙ্গিতে যুদ্ধ হয়। সেই অতি শক্তিশালী পুত্র সন্তান প্রমথগণ, বিষ্ণু ও সকল দেবতাদের যুদ্ধে পরাজিত করেন। তখন শিব ক্রুদ্ধ হয়ে ত্রিশূলের দ্বারা তাঁর মস্তক ছিন্ন করেন। এই সংবাদ শুনে মাতা পার্বতী শোকাহত ও ক্রুদ্ধ হয়ে বিশ্বসৃষ্টি বিনষ্ট করতে উদ্যত হলে নারদ ও দেবগণ তাকে শান্ত করেন। শিব তখন প্রমথগণকে উত্তরমুখে প্রেরণ করেন এবং যাকে প্রথমে দেখা যাবে তারই মস্তক নিয়ে আসতে বলেন। তারা একটি হাতিকে দেখতে পেয়ে হাতির মাথা নিয়ে উপস্থিত হন ও দেবাদিদেব এই হস্তিমুণ্ডের সাহায্যেই তাঁকে পুনরুজ্জীবিত করেন । এরপর অনন্তর শিব তাকে নিজপুত্র রূপে স্বীকার করেন। দেবগণের আশীর্বাদে এই কুমার সকলের পূজ্য হন ও গণেশ নামে আখ্যাত হন।
আবার স্কন্দপুরাণ-এর ব্রহ্মখণ্ডে উল্লিখিত কাহিনী অনুসারে, মাতা পার্বতী তাঁর গায়ের ময়লা থেকে গণপতিকে সৃষ্টি করেছিলেন। এরপর পার্বতী সেই পুত্রকে নিজের স্নানাগারের দ্বাররক্ষকের দায়িত্ব অর্পণ করেন। তখন হঠাৎ শিব স্নানাগারে প্রবেশ করতে গেলে সেই বালক-কুমার তাঁকে বাধা দিলে শিবের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ হয় ও শিব ত্রিশূল দিয়ে তাঁর মস্তক ছিন্ন করেন। এরপর দুঃখিত মহাদেব গজাসুরকে সামনে পেয়ে তার মস্তকের সাথে বালকের দেহ যুক্ত করেন। দেবাদিদেবের আশীর্বাদে সেই কুমার গণাধিপতি হয়ে উঠেছিলেন। মহাদেব তখন বলেছিলেন, সর্বাগ্রে গণপতির পূজা না করলে কার্যসিদ্ধি হবে না।
বৃহদ্ধর্মপুরাণে বর্ণিত কাহিনী অনুসারে, পার্বতী পুত্রলাভে ইচ্ছুক হলে শিব অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। অগত্যা পার্বতীর পীড়াপীড়িতে শিব পার্বতীর বস্ত্র টেনে সেটিকেই পুত্রজ্ঞানে চুম্বন করতে বলেন। পার্বতী সেই বস্ত্রকে পুত্রের আকার দিয়ে কোলে নিতেই সেটি জীবিত হয়ে ওঠে। হঠাৎ সেই স্বল্পায়ু পুত্রের মস্তক ছিন্ন হলে শোকাহত পার্বতী নন্দীকে উত্তর দিকে শায়িত প্রাণীর মাথা নিয়ে আসতে বললে সে একটি হস্তির মস্তক নিয়ে আসে। মহাদেব তখন সেই হস্তীমুন্ডের সাথে সেই বালকের দেহ যুক্ত করেন।
আবার ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে, শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মধারী নারায়ণকে দেখে মুগ্ধ হয়ে পার্বতী অনুরূপ একটি পুত্রকামনা করেন। বিষ্ণুও তাকে ইচ্ছাপূরণের বর দেন। এরপর একদিন শিব ও পার্বতী স্বগৃহে ক্রীড়ারত ছিলেন। সেই সময় শ্রীবিষ্ণু বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের বেশে ভিক্ষা চাইতে এলে পার্বতী তাকে ভিক্ষা দিতে গেলে শিবের বীর্য পতিত হয় ও নারায়ণ শিশুর বেশে পালঙ্কে আবির্ভূত হন। বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ অন্তর্হিত হন। পার্বতী তখন পালঙ্কে ‘শতচন্দ্রসমপ্রভম্’ এক শিশুকে শয্যায় দেখতে পেয়ে আনন্দিত হন। এরপর দেবতা ও ঋষিগণ কুমারকে দেখতে শিবের ভবনে আসেন। তখন শনি দেবও উপস্থিত হন। এমন সময় শনি নিজের কুদৃষ্টির কথা পার্বতীকে জানালেও পার্বতী তাঁকে পীড়াপীড়ি করলে তিনি কুমারকে দেখতে সম্মত হন। কিন্তু শনি সভয়ে বাঁ-চোখের কোণ দিয়ে কুমারকে দেখামাত্র তার মস্তক ছিন্ন হয়ে যায়। পার্বতী প্রবল শোকাহত হতে দেখে বিষ্ণু গরুড়কে নিয়ে পুষ্পভদ্রা নদীর তীর থেকে উত্তরদিকে মুখ করে শুয়ে থাকা এক হস্তীশাবকের মস্তক নিয়ে আসেন। এমন সময় হস্তীরা শোকাহত হলে সেই একটি মাথা থেকে দুটি মাথা সৃষ্টি করে একটি মস্তক গণেশের ও অন্য মস্তকটি দিয়ে সেই হস্তীশাবককে জীবনদান করা হয়।
মানা হয়ে থাকে, ভাদ্রমাসের শুক্লাচতুর্থীকে গণেশ চতুর্থী বলা হয়। প্রচলিত হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনটি গণেশের জন্মদিন। এই দিন সারা দেশ জুড়ে মহা ধুম ধাম করে গণেশ পূজো অনুষ্ঠিত হয়।
গণেশের কিছু বিশেষ মন্ত্র :
গণেশের ধ্যান — “ওঁ খর্বং স্থূলতনুং গজেন্দ্রবদনং লম্বোদরং সুন্দরং প্রস্যন্দন্মদ্গন্ধলুব্ধমধুপব্যালোলগণ্ডস্থলম্। দন্তাঘাতবিদারিতারিরুধিরৈঃ সিন্দূরশোভাকরং বন্দে শৈলসুতাসুতং গণপতিং সিদ্ধিপ্রদং কামদম্।।”
— অর্থাৎ — যিনি খর্বাকৃতি, স্থূলশরীর, লম্বোদর, গজেন্দ্রবদন অথচ সুন্দর; বদন হইতে নিঃসৃত মদগন্ধে প্রলুব্ধ ভ্রমরসমূহের দ্বারা যাঁহার গণ্ডস্থল ব্যাকুলিত; যিনি দন্তাঘাতে শত্রুর দেহ বিদারিত করিয়া তাহার দন্ত দ্বারা নিজ দেহে সিন্দূরের শোভা ধারণ করিয়াছেন; সেই পার্বতীপুত্র সিদ্ধিদাতা ও কামদাতা গণপতিকে বন্দনা করি।
গণেশের প্রণামমন্ত্র — একদন্তং মহাকায়ং লম্বোদরং গজাননং।
বিঘ্ননাশকরং দেবং হেরম্বং প্রণমাম্যহম্।।
অর্থাৎ — যিনি একদন্ত, মহাকায়, লম্বোদর, গজানন এবং বিঘ্ননাশকারী সেই হেরম্বদেবকে আমি প্রণাম করি।