নিজস্ব প্রতিনিধি, বিহার: ছোটবেলায় একটা গল্প কমবেশি আমরা সকলেই শুনেছি। এক সাধুর একটি পোষা ইঁদুর ছিল। ইঁদুরটিকে একদিন একটি বেড়াল ভয় দেখালো, সাধু তাকে বেড়ালে পরিণত করলেন। তারপর বেড়ালকে আক্রমণ করতে এল বাঘ। সাধু বেড়ালকে বাঘে পরিণত করলেন। এবার বাঘ হয়ে ইঁদুর আক্রমণ করতে এল সাধুকে। সাধু বুঝলেন যাকে তিনি এত ভালবাসলেন সেই তাঁকে হত্যা করতে চাইছে। তাই ‘পুনর্মূষিক ভবঃ’ বলে আবার তিনি বাঘকে ইঁদুরের রূপ দিলেন। এই গৌরচন্দ্রিকা করার একটাই কারণ, যে যাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসে তাঁর থেকেই আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সব থেকে বেশি থাকে। এ যেন চিরন্তন সত্য। ঠিক যেমন বিহারের জয় কুমার সাহানি। তাঁকে বলা হত সাপেদের ‘মসিহা’। সর্পকুলকে বিপদ-আপদ থেকে তিনিই রক্ষা করতেন। সেই ‘মসিহা’রই মৃত্যু হল সাপের ছোবলে।
ঘরে বিষাক্ত সাপ ঢুকেছে, ডাক পড়ত জয় কুমার সাহানির। সাপ নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করতেন তিনি। সাপের সঙ্গে খেলার একাধিক ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল। সেই সাপের বিষেই হল কিনা মৃত্যু! ঠিক যেন আর্থার কনান ডয়েলের ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ স্পেকেল্ড ব্যান্ড’ গল্প।
জয় কুমার সাহানি ছিলেন বিহারের হরপুর ভিন্ডি ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। গত পাঁচ বছর ধরে সাপ উদ্ধার করে মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজে নিজেকে লিপ্ত করেছিলেন তিনি। উদ্ধার করেছিলেন প্রায় দুই হাজারেরও বেশি সাপ। জয় সাপ উদ্ধার করে জঙ্গলে ছেড়ে দিতেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর ছিল পশুপাখির প্রতি অনুরাগ। আর সাপের সঙ্গে খেলা ছিল নেশা।
বৃহস্পতিবার জয়ের কাছে পার্শ্ববর্তী একটি গ্রাম থেকে ফোন আসে। বলা হয়, ওই এলাকায় একটি বিষাক্ত সাপ দেখা গিয়েছে। তৎক্ষণাৎ ছুটে যান জয়। সাপটিকে দেখতে পেয়ে উদ্ধারকাজ শুরু করলে সাপটি তাঁর ডান হাতের বুড়ো আঙুলে কামড় দেয়।
সঙ্গে সঙ্গে পরিবারের সদস্য এবং গ্রামবাসীরা জয় কুমার সাহানিকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখান থেকে তাঁকে সদর হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সর্প ‘মসিহা’ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ১৩ বছর আগে বিয়ে করেছিলেন জয় সাহানি। ছিলেন দুই সন্তানের বাবা। সাপের কামড়ে এমন হাসিখুশি যুবকের মৃত্যুতে এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিস্ট স্টিভ আরউইইনের ছিল কুমীর, সাপ, জলের তোলার প্রাণীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব। সারা বিশ্ব তাঁকে এক ডাকে চিনত ক্রোকোডাইল হান্টার নামে। ২০০৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর গ্রেট ব্যারিয়ার রিফে জলের তলায় তথ্যচিত্রের শুটিং করার সময় একটি স্টিং রে’র আক্রমণে আরউইন মারা যান। যাদের সঙ্গে কাটিয়ে ছিলেন সারা জীবন তাদেরই একজন হয়ে উঠেছিল অস্ট্রেলিয়ার আরউইনের মৃত্যুর কারণ। ভারতের জয় কুমার সাহানির ক্ষেত্রেও এই নিয়মের কোনও অন্যথা হল না।