নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: ইয়েমেনি নাগরিককে খুনের দায়ে আগামী ১৬ জুলাই (বুধবার) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হচ্ছে কেরলের নার্স নিমিশা প্রিয়ার। ওই মৃত্যুদণ্ড রোধ করা যে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়, সোমবার (১৪ জুলাই) তা শীর্ষ আদালতে স্বীকারই করে নিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটরামানি। শীর্ষ আদালতের বিচারপতি বিক্রম নাথ ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার এজলাসে এ সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে অসহায় কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ইয়েমেনের নাগরিককে খুনের দায়ে কেরলের নার্স নিমিশা প্রিয়ার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দুর্ভাগ্যজনক। মৃত্যুদণ্ড রোধ করার বিষয়ে যতটা পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, সব করা হয়েছে। মনে হয় না আমরা আর বেশি কিছু করতে পারব।’
আগামী ১৬ জুলাই ফাঁসিতে ঝোলানো হবে ব্যবসায়িক অংশীদার এক ইয়েমেনি নাগরিককে খুনের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত কেরলের মেয়ে নিমিশা প্রিয়াকে। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বরই পেশায় নার্স প্রিয়ার মৃত্যুদণ্ডের সাজায় সিলমোহর দিয়েছিলেন ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল আলিমি। আর ওই সিলমোহরের পরে ৩০ জানুয়ারির মধ্যেই ফাঁসি হওয়ার কথা। কিন্তু ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তরফ থেকে নিমিশার ফাঁসি রদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। মৃত্যুদণ্ড যাতে না হয় সেই চেষ্টা চালানো হয়েছিল। সম্প্রতি খবর পাওয়া যায় আগামী বুধবারই নিমিশার ফাঁসি কার্যকর করা হবে।
ওই ফাঁসি যাতে রোধ করা যায় তার আর্জি জানিয়ে শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল ‘সেভ নিমিশা প্রিয়া ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকশন কাউন্সিল’। ওই মামলার শুনানিতে বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি সন্দীপ মেহতার বেঞ্চে মামলার শুনানিতে সংগঠনের আইনজীবী বলেন, ‘নিমিশা প্রিয়াকে বাঁচানোর একমাত্র উপায় হল যদি নিহতের পরিজনরা (ইয়েমেনি ব্যক্তির পরিবার) ‘রক্তের টাকা’ (অর্থাৎ, আর্থিক ক্ষতিপূরণ) গ্রহণ করতে রাজি হন। নিহতের পরিবারকে ১ মিলিয়ন ডলার বা ৮.৫ কোটি টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, কিন্তু এখনও পর্যন্ত তা গ্রহণ করা হয়নি। “সম্মানের প্রশ্ন” বলে ওই ক্ষতিপূরণের অর্থ প্রত্যাখ্যান করেছে নিহতের পরিবার। অ্যাটর্নি জেনারেল আর ভেঙ্কটারামানি বলেন, ‘এটি একটি অত্যন্ত জটিল মামলা। কেন্দ্রের তরফে যথাসাধ্য চেষ্টা চালানো হয়েছে। আমদের আর তেমন কিছু করার নেই।
কেন ইয়েমনে ফাঁসির সাজা পেতে হল ভারতীয় মেয়ে নিমিশা প্রিয়াকে?
কেরলের পালাক্কড় জেলার বাসিন্দা পেশায় নার্স নিমিশা স্বামী টমি থমাস এবং মেয়েকে নিয়ে ইয়েমেনে থাকতেন তিনি। ২০০৮ সাল থেকে সেখানকার এক বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করতেন নিমিশা। ২০১৪ সালে তাঁর স্বামী এবং ১১ বছরের কন্যা ভারতে ফিরে এলেও ইয়েমেনেই নিজের ক্লিনিক খোলার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে থেকে যান তিনি। ওই বছরই ইয়েমেনি নাগরিক তালাল আব্দো মাহদির সঙ্গে যোগাযোগ হয় নিমিশার। মাহদি তাঁকে নতুন ক্লিনিক খুলতে সাহায্য করবেন বলে আশ্বাস দেন। কারণ, ইয়েমেনের আইন অনুযায়ী, সে দেশে নতুন ব্যবসা শুরু করতে গেলে দেশীয় অংশীদারের দরকার হয়। ২০১৫ সালে মাহদি ও নিমিশা মিলে নতুন ক্লিনিক খোলেন। এর পর থেকেই দু’জনের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। অভিযোগ, নিমিশার টাকাপয়সা কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে মাদকসেবনেও বাধ্য করেন মাহদি। বিরোধ বাড়তে বাড়তে এক পর্যায়ে তাঁর পাসপোর্ট কেড়ে নেন মাহদি, যাতে কোনও ভাবেই নিমিশা ইয়েমেন ছাড়তে না-পারেন। আইনি কাগজপত্রে নিমিশাকে নিজের স্ত্রী হিসাবে পরিচয় দিয়েছিলেন মাহদি, ফলে নিমিশার প্রশাসনিক সাহায্য পাওয়া জটিল হয়ে পড়ে।
মাহদির প্রতারণার বিষয়টি নিয়ে একাধিক বার পুলিশের দ্বারস্থ হলেও কোনও লাভ হয়নি নিমিশার। মাসখানেক জেলে থাকার পরেই ছাড়া পেয়ে যান মাহদি। জেল থেকে বেরিয়ে নিমিশার জীবন আরও দুর্বিষহ করে তোলেন তিনি। ফলে ওই নরক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে অন্য পথ বেছে নেন নিমিশা। ২০১৭ সালের ২৫ জুলাই মাহদিকে ঘুমের ইঞ্জেকশন দেন ওই নার্স। ওভারডোজের কারণে মৃত্যু হয় মাহদির। এর পর হানান নামে এক সহকর্মীর সঙ্গে মিলে মাহদির দেহ টুকরো টুকরো করে কেটে জলের ট্যাঙ্কে ফেলে দেন। ওই মাসেই ইয়েমেন ছেড়ে পালানোর সময় ধরা পড়ে যান নিমিশা। অংশীদার মাহদিকে হত্যার দায়ে ২০১৮ সালে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে ইয়েমেনের আদালত। মৃত্যুদণ্ড পান নিমিশা। তার পর থেকে ৩৬ বছর বয়সি নিমিশাকে বাঁচানোর সব রকম চেষ্টা করেছে তার পরিবার। শেষ চেষ্টা হিসাবে ‘দিয়া’ (নিহতের পরিবারের নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের অঙ্ক) দিয়ে মেয়েকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছেন নিমিশার মা প্রেমা কুমারী। কিন্তু কোনও লাভ হয়নি। গত বছর নিমিশার সাজা মকুবের শেষ আবেদনও খারিজ হয়ে গিয়েছে সে দেশের সুপ্রিম কোর্টে। তার পরেই ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট রাশাদ আল আলিমি গত ৩০ ডিসেম্বর নিমিশার মৃত্যুদণ্ডের সাজায় স্বাক্ষর করেছেন।