পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : ভারতীয় পৌরাণিক তন্ত্রশাস্ত্র এক অগাধ ও অত্যন্ত সুগভীর বিষয়, যার অতি সামান্য অংশ সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়াই দুস্কর। জানা যায়, ভারতীয় তন্ত্রশাস্ত্রে যে রহস্য, শক্তি ও অতীন্দ্রিয় চেতনার প্রকাশ ঘটে, তার এক বিস্ময়কর রূপ হলো ৬৪ যোগিনী, যাঁদের অধিকাংশই আমাদের অজানা। এঁরা কেবল কল্পনার নারীমূর্তি নন, বরং তন্ত্রসাধনার একেকটি স্তম্ভ, একেকটি তান্ত্রিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু। পৌরাণিক শাস্ত্রানুসারে এই যোগিনীরা আদ্যাশক্তি মহামায়া মা কালীকা থেকেই উদ্ভূত এবং তাঁদের প্রত্যেকে এক একটি অনন্য শক্তির ধারক। তাঁরা বিশ্বচক্রের নানা স্তরে শাসক ও রক্ষক—ধর্ম, প্রকৃতি, শক্তি ও চৈতন্যের গভীর প্রতিভূ।
আদি উৎস ও তান্ত্রিক ব্যাখ্যা
৬৪ যোগিনী ধারণাটি মূলত তন্ত্রমার্গভিত্তিক সাধনা থেকে এসেছে। এই যোগিনীরা কেবল দেবী কালী বা দুর্গার সহচরী নন, তাঁরা নিজেরাই পূর্ণ স্বাধীন সত্তা। বিভিন্ন পৌরাণিক শাস্ত্র থেকে জানতে পারা যায়, তাঁরা দেবী দুর্গার আট মাতৃকার মধ্য থেকে উদ্ভূত, যাঁদের প্রত্যেকে আবার নিজ নিজ আটটি শক্তির সৃষ্টি করেন—এইভাবে সংখ্যা দাঁড়ায় ৮ × ৮ = ৬৪। এই ভাবেই সৃষ্টি হয়েছে হিন্দু তন্ত্রশাস্ত্রের ৬৪ জন যোগিনী।
এই শক্তিরা শুধু প্রতীকি নন। তন্ত্র অনুসারে, যোগিনী হলেন “যোগের অধিকারিণী”—যাঁরা ধ্যান, সাধনা, ভিন্নতর চেতনায় উত্তরণ, এবং প্রকৃতির সূক্ষ্ম শক্তিগুলির সঙ্গে সংযোগের প্রতীক। পুরুষের ক্ষেত্রে যেভাবে যোগীর ধারণা থাকে, নারীর ক্ষেত্রে তা “যোগিনী”।
৬৪ যোগিনীর বৈশিষ্ট্য ও অধিষ্ঠান
৬৪ যোগিনীর মূর্তিগুলির গঠনশৈলীতে পাওয়া যায় অতীন্দ্রিয় রূপের ছাপ। কোথাও তাঁরা পশুর পৃষ্ঠে অবস্থান করছেন, কোথাও মৃতদেহের উপর। তাঁদের বাহন যেমন: কচ্ছপ, সিংহ, উট, বানর, আবার কখনও শঙ্খ, পদ্ম কিংবা খণ্ডিত মানবদেহ। এই প্রতিটি বাহন বা ভিত্তি আসলে প্রতীক, যা আসলে জীবনের রূপ, শক্তি ও তন্ত্রীয় স্তরের সূচক।
মূর্তিগুলি ভাল করে নিরীক্ষণ করলে দেখা যাবে, অধিকাংশ মূর্তিতে তাঁরা নানালঙ্কারভূষিতা — যেমন : গলাবন্ধ, বাজুবন্ধ, খোঁপা, কিরীটা, তূর্ণী, খড়্গ, মুণ্ডমালা প্রভৃতি। এ সবই তাদের শক্তি ও ভয়ালতার প্রতীক। যেমন বহুরুপা অবস্থান করছেন এক পুরুষের মৃতদেহের উপর, চার হাতে ধারণ করছেন অস্ত্র; তাঁর রূপেই স্পষ্ট একাধারে সৃষ্টি ও ধ্বংসের ইঙ্গিত।
তন্ত্রসাধনা মানেই চেতনার গহন অরণ্যে এক নিঃশব্দ অভিযান। এই পথে যে শক্তিরা পথপ্রদর্শক, যাঁরা দেহ-মন-চেতনার সব স্তরে প্রভাব ফেলেন, তাঁদের অন্যতম হলেন ৬৪ যোগিনী। প্রতিটি যোগিনী এক একটি শক্তির রূপ। ভয়াল, রহস্যময়, অলংকৃত—তাঁদের বাহন থেকে শুরু করে অঙ্গসজ্জা সবকিছুতেই প্রতিফলিত হয়েছে তন্ত্রের রস, রহস্য ও রুদ্রতা। এই যোগিনীরা কেবল মহাকালীর ছায়ারূপী আবির্ভূতা নন, তাঁদের প্রত্যেকের নিজস্ব একটি চেতনা, প্রতীক ও উদ্দেশ্য আছে। তাঁদের মূর্তিগুলিতে একদিকে যেমন আছে সৌন্দর্য ও অলংকারের ছটা, তেমনি অন্যদিকে জ্বলছে খড়্গ, রক্ত, মুণ্ডমালা—ভয় ও শক্তির প্রকাশ।
প্রথম দশ যোগিনী: শক্তি ও রূপের উন্মেষ
যোগিনীদের শুরু হয় বহুরুপা দিয়ে—চার হাতে দণ্ডায়মান, পুরুষ মরদেহের উপর অবস্থানরতা । তাঁরা অলংকারে সুসজ্জিতা, তাঁদের খোঁপা বিশাল। তারা ও নর্মদা একই ধারা বহন করেন—মৃতদেহ ও হাতির উপর তাঁদের অবস্থান, মুণ্ডমালা ও খুলি-পাত্রসহ রক্তপানরত অবস্থান।
যমুনা, চতুর্ভূজা এই যোগিনী কচ্ছপের উপর, খোলসের মতো আত্মরক্ষা এবং স্থিরতার প্রতীক। শান্তি বা লক্ষ্মী পদ্মাসনে, সর্প বাহুবন্ধনী ধারণ করে আছেন। বারুনী, জলতরঙ্গে খোদিত মূর্তি, মাথার বাঁ পাশে খোঁপা, জলতত্ত্বের শক্তি।
এরপর ক্ষেমঙ্করী, কুমিরের উপর আসীন, চার হাতে মালা ও গহনায় সজ্জিত। আদ্রি হস্তির পিঠে, শক্তিশালী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বারাহী রুদ্র রূপে শূকরমুখী, ধনুক ও মুণ্ডপাত্রধারিণী। রণভীরা, ভুজঙ্গ বাহিনী, খড়্গধারিণী ও মুণ্ডমালাধারিণী।
প্রাণিজ বাহন ও রূপবৈচিত্র্যে ১১-২০ যোগিনী
বানর-মুখী উটের উপর, প্রাণীতত্ত্বের প্রতীক। বৈষ্ণবী গরুড়বাহিনী, কোঁচকানো কেশের মধ্যে দৃঢ়তা। কালরাত্রি, ভাল্লুকের উপর, খোঁপাবিন্যস্ত এক ভয়াল মূর্তি।
বৈদ্যরূপা ঢাকের উপর অবস্থান, সঙ্গীতের প্রতীক। চর্চিকা, পুরুষ দেহের উপর, হাতে পদ্ম ও কোমরে দা। বৈতালী মৎস্য বাহিনী, মুণ্ডমালাধারিণী। ছিন্নমস্তা, ছিন্নমস্তকের উপর, বাম হস্তে ধনুক—এক বিস্ময়কর শক্তির প্রতীক।
বৃষবাহন, মহিষমুখী, গুহাদ্বারে দাঁড়িয়ে রুদ্ররূপিণী। জ্বালা কামিনী, ব্যাঙের উপর, পোশাকে কোমরবন্ধন। ঘটাভারা, হস্তিমুখী, সিংহের পৃষ্ঠে অবস্থান।
প্রতীকী শক্তির বাহক ২১-৩০
কারাকালী, সারমেয় বাহিনী, পায়ের নূপুর বাঁধছেন নিজ হাতে—একান্ত নারীত্বের ছোঁয়া। সরস্বতী, নাগের উপর, বীনা সদৃশ যন্ত্রসহ, গোঁফসহ পুরুষালি রূপ।
বীরূপা, তরঙ্গরেখার উপর, জলের প্রতীক। কৌবেরী, সাতটি রত্নঘড়া, পদ্মে বসে। ভাল্লুকা, ভাল্লুকমুখী, ডমরু হাতে, শরীরে রোমরাশি।
নারসিংহী, সিংহমুখী, পাত্র ধারণ করে রুদ্ররূপে। বির্যা, পদ্ম কুঁড়ির উপর কমনীয়তায় প্রতিষ্ঠিত। বিকটাননা, চঞ্চু ঠোঁটসহ রহস্যময়, বাহন ভগ্ন। মহালক্ষী, সর্পমালা ও বজ্রসহ পদ্মাসনে। কৌমারী, ময়ূর বাহিনী, রুদ্রাক্ষের মালা ও ভাঙা ঢাল।
৩১-৪০: মূর্তিমান শক্তির বিস্তার
মহামায়া, অষ্টভুজা, মন্দিরের মূল অধিষ্ঠাত্রী, বিশাল পদ্মে প্রতিষ্ঠিত। রতী/উষা, তূর্নী-ধারিণী, মদনদেবের উপর অবস্থান। কর্করী, কাঁকড়ার উপর, খোঁপা বাঁ পাশে। সর্পসায়া, সর্পমুখী, অলংকৃত।
যক্ষীনী, চার পা বিশিষ্ট টেবিলের উপর অবস্থান, মুকুটধারিণী। অঘোরা, ছাগ বাহিনী, খোঁপা উঁচু। রুদ্রকালী, কাকের উপর অবস্থান, তরোয়ালধারিণী। বিনায়িকী, হস্তিমুখী, গর্ধবের উপর অবস্থান । বিন্ধবাসিনী, মুষকের উপর অবস্থান, ধনুকধারিণী। কুমারী, বৃশ্চিকের উপর অবস্থান, চার হাত উত্তোলিত।
৪১-৫০: দেবতুল্য এবং বৈচিত্র্যময়
মাহেশ্বরী, ষাঁড়ের উপর অবস্থান, কোমরবন্ধে দীপ্ত। অম্বিকা, নকুলের পৃষ্ঠে অবস্থান, চক্রাকার কাঠামো। কামিনী, মোরগের উপর অবস্থান, অলংকৃত। ঘটাবরী, সিংহবাহিনী, কুঞ্চিত কেশে।
স্তুতি, হলুদের পাত্রে অবস্থান, ফুল দিয়ে সাজানো খোঁপা। কালী, অর্ধ শায়িত শিবের উপর দণ্ডায়মান, ত্রিশূলধারিণী। উমা, পদ্মফুলে, নাগপাশ ও অভয় মুদ্রায় শক্তিসম্পন্ন। নারায়ণী, তরোয়াল ও সুরাপাত্রধারিণী।
সমুদ্রা, শঙ্খের উপর অবস্থান, খোঁপা বাঁ পাশে। ব্রাহ্মণী, তিনমস্তক বিশিষ্টা, পৈতা ধারণকারিণী, সিংহচিত্র ও পুস্তকে প্রতিষ্ঠিত।
শেষ ১৪ জন: রহস্যময়তা ও শক্তির এক মহাসিন্ধু
জ্বালামুখী, চৌকির উপর অবস্থান, লম্বা কর্ণধারিণী। আগ্নি, ভেড়ার উপর অবস্থান, পিছনে অগ্নিশিখা। অদিতি, টিয়াপাখির উপর অবস্থান, সরল কিন্তু উজ্জ্বল।
চন্দ্রকান্তী, কাঠের চৌকিতে অবস্থান, অলংকৃত। বায়ুবেগা, স্ত্রী চামরী গাইয়ের উপর অবস্থান, খোঁপাসজ্জা। চামুণ্ডা, কঙ্কালসার, সিংহবাহিনী, মুণ্ডমালাসহ ভয়াল। মূর্তি, হরিণের উপর, অলঙ্কৃত।
গঙ্গা, মকর বাহিনী, পদ্ম ও নাগপাশসহ প্রতিষ্ঠিত। ধুমাবতী, রাজহংসের উপর অবস্থান, শস্য ঝাড়াইযন্ত্র হাতে। সর্বমঙ্গলা, মূর্তি স্থানান্তরিত, বর্তমানে শূন্য।
অজিতা, হরিণের উপর অবস্থান, চর্তুভুজা, অলংকারে সজ্জিতা। সূর্যপুত্রী, ঘোড়ায় অবস্থান, ধনুক ও তূর্নীধারিণী। বায়ুবীনা, নৃত্যরত, কালো পুরুষমৃগের উপর অবস্থান, পাশে ফুলদানী বর্তমান ।
এই ৬৪ যোগিনীরা কেবল পৌরাণিক চরিত্র নন, তাঁরা শক্তির প্রতীক, তন্ত্রসাধনার নির্যাস এবং মানবমনের অন্তর্গত চেতনার বহির্প্রকাশ। প্রত্যেকটি মূর্তি যেন এক একটি জীবন্ত দ্যোতনা—যাঁদের রূপে আছে ভয়, রুদ্রতা, মমতা, সংগীত, সৃষ্টি ও ধ্বংস। এই দেবীরা যুগের পর যুগ ধরে শক্তিসাধকের আশ্রয়, ভয়ের উৎস ও মুক্তির পথপ্রদর্শক।
তাঁদের রূপ বর্ণনা করে শেষ করা যায় না—তাঁরা প্রত্যেকেই নিজস্ব এক মহাশক্তির সঞ্চার। তাঁরা শুধু পূজিত নন, অনুভবযোগ্য, উপলব্ধিযোগ্য। তন্ত্রের ভাষায়, যোগিনী মানেই “অভ্যন্তরীণ শক্তির প্রবাহ”—যে প্রবাহ আমাদের ভয়ের অতীত, বোধের অতীত, সময়ের অতীত এক চেতনার দিকে এগিয়ে নেয়। এই যোগিনীরা আজও ভারতের নানা প্রাচীন মন্দিরে, বিশেষ করে হীরাপুর ও খাজুরাহোর মন্দিরে, ইতিহাস ও চেতনার নিদর্শন হয়ে বিরাজমান।