পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : নারীর সৌন্দর্য্য, গুণ ও শক্তি বর্ণনা করতে পার্বতী লক্ষ্মী ও সরস্বতীর মত অসামান্যা সুন্দরী পরমাপ্রকৃতি দেবীদের সঙ্গে লোকমুখে আরও এক দেবীর নাম ঘোরে। কোনও অপরূপা সুন্দরী মেয়ে দেখলেই লোকজনের কথাতেই উঠে আসে সেই দেবীর নাম। যিনি ছিলেন প্রকৃতপক্ষে একজন নর্তকী বা অপ্সরা। বিভিন্ন হিন্দু ও বৌদ্ধ সাহিত্যে, স্থাপত্যে, চিত্রকলায় ছড়িয়ে রযেছে তাদের নানা গল্প। পুরাণ-মতে, অপ্সরা-রা অপরূপা সুন্দরী। স্বর্গে তাঁদের মূল কাজ ছিল দেবতাদের মনোরঞ্জন। তাঁরা নৃত্য, গীত ও অন্য কলায় পারদর্শী।
পুরাণ এবং মহাকাব্যগুলি থেকে বিভিন্ন অপ্সরার নাম পাওয়া যায়। তবে যাঁর কথা বলা হচ্ছে, তিনি ছিলেন মূলত ইন্দ্রের সভার প্রধানা অপ্সরী। যাঁর রূপ বলে বোঝাবার নয়। নারীসুলভ চেহারায় কামোত্তেজক ও ইন্দ্রিয়স্পর্শদায়ক বলতে যা বোঝায়, তিনি ছিলেন ঠিক তাই। তিনি হলেন ঊর্বশী। হিন্দুধর্মের অনেক বৈদিক ও পুরাণ শাস্ত্রে ঊর্বশীর উল্লেখ আছে। জানা যায়, তিনিই একমাত্র অপ্সরা, যাঁকে ঋগ্বেদে বিশেষভাবে নামকরণ করা হয়েছে। ঋগ্বেদ মণ্ডল ১০-এ তিনি ও তাঁর স্বামী পুরূরবার মধ্যে কথোপকথন উল্লেখ রয়েছে।
তবে এক্ষেত্রে মানুষের কৌতূহলী মনে প্রশ্ন জাগা অসম্ভব নয় যে, তাঁর এমন ঊর্বশী নাম হয়েছিল কেন ? আর, কী ভাবেই বা সৃষ্টি হয়েছিলেন তিনি? কথিত আছে, ‘দেবীভাগবত পুরাণে’ এই বিষয়ে বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। পুরাণে বর্ণিত কাহিনী অনুসারে, একদা ধর্ম রক্ষার্থে বিষ্ণু নর ও নারায়ণ নামের দুই পুরষের অবতারে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। তাঁরা সন্ন্যাস ব্রত ধারণ করে সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে খুশি করার জন্য কঠোর তপস্যা শুরু করেন। কিন্তু, নর-নারায়ণের এমন তপস্যা দেখে দেবরাজ ইন্দ্র তাঁর আসন হারানোর ভয় পান এবং তাঁদের তপোভঙ্গের জন্য কামদেব-রতি , ঋতুরাজ বসন্ত, রম্ভা, মেনকা ও তিলোত্তমাসহ অন্যান্য অপ্সরাদের প্রেরণ করেন।
প্রেমের দেবতা কামদেব রতির সাথে ও অন্যান্য অপ্সরারা নর-নারায়ণের কাছে গিয়ে তাঁদের সামনে প্রলোভনসঙ্কুলভাবে নাচতে শুরু করে। এই কাণ্ডে অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে শ্রী নারায়ণ একটি ফুল নিয়ে তাঁর ঊরুতে রাখেন ও ঊরুতে করাঘাত করেন। সাথে সাথে সেখান থেকে বহির্গত হন অপরূপা সুন্দরী ঊর্বশী। যাঁর রূপ দেবরাজ ইন্দ্রের সকল অপ্সরাদের ছাপিয়ে যায়। এমন কাজের জন্য তাঁরা সকলেই লজ্জিত হন। নর ও নারায়ণ দেবরাজ ইন্দ্রকে জানান যে, তাঁর সিংহাসনের প্রতি তাঁদের কোনও লোভ নেই বরং তাঁরা ঊর্বশীকে তাঁকে উপহার দেবেন। জানা যায়, উর্বশী ইন্দ্রের সভার অন্যতম শ্রেষ্ঠ অপ্সরার স্থান পেয়েছিলেন।