পৃথ্বীজিৎ চট্টোপাধ্যায় : প্রকৃতিং পরমামভয়াং বরদাং ,
নররূপধরাং জনতাপহরাম্ ।
শরণাগত-সেবক তোষকরীং ,
প্রণমামি পরাং জননীং জগতাম্ ।।
কথিত আছে, পুরাকালে মুনিঋষিরা কুমারীপুজোর মাধ্যমে প্রকৃতিকে পুজো করতেন আর, নারী মানেই প্রকৃতি। দেবী পুরাণে বর্ণিত কাহিনী অনুসারে জানা যায়, সাধারণত ১ বছর থেকে ১৬ বছরের অজাতপুষ্প সুলক্ষণা কুমারীকে পুজো করা হয়ে থাকে। পরমহংস শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ কুমারী পুজো প্রসঙ্গে বলেছিলেন, শুদ্ধাত্মা কুমারীতে ভগবতীর প্রকাশ। প্রকৃতপক্ষে এই কুমারী পুজোর মাধ্যমে নারীজাতির উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়ে থাকে। প্রসঙ্গত বঙ্গে ১৯০১ সালে প্রথম কুমারী পুজোর সূচনা করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন তথা, বেলুড়মঠে নয় কুমারীকে পুজো করেছিলেন। তখন থেকেই প্রচলিত রীতি অনুসারে প্রতি বছর দুর্গাপুজোর অষ্টমী তিথিতে বেলুড় মঠে মহা ধুমধাম করে এই কুমারী পুজো হয়ে আসছে।
কিন্তু কেন করা হয় এই কুমারী পুজো ? এর নেপথ্যে কি কারণ আছে ?
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, একদা বানাসুর নামে এক দুর্ধর্ষ অসুর স্বর্গ, মর্ত, পাতাল দখল করে নিয়েছিল। সেই সময়ে বিপন্ন দেবগণ মহাকালীর স্মরনাপন্ন হয়েছিলেন। দেবগণকে রক্ষা করতে দেবী দুর্গা কুমারীরূপে পুনর্জন্ম নেন। জানা যায়, দেবী ওই কুমারী রূপেই বানাসুরকে বধ করেছিলেন। সেই থেকেই মর্ত্যে এই পুজোর প্রচলন হয়।
প্রথাগত ভাবে দুর্গাপুজোর অষ্টমীর দিন শিশুকন্যা বা কুমারী কন্যাকে স্নান করিয়ে মাতৃ মূর্তির মতো করে সাজানো হয়। তারপর দেবী মূর্তির সামনে বসিয়ে সেই কুমারী কন্যার আরাধনা করা হয়। পুজোয় দেবী দুর্গাকে যে ভোগ দেওয়া হয়, সেই ভোগই অর্পণ করা হয় সেই কুমারী কন্যার উদ্দেশ্যেও। এরপর তার পায়ে ফুল দিয়ে প্রণাম করা হয়।
এই পুজোতে জাতি, ধর্ম, বর্ণের কোনও ভেদাভেদ নেই। যে কোনও কুমারীই দেবীজ্ঞানে পূজিতা হয়ে থাকে। দুর্গা তথা কালী, লক্ষ্মী ও সরস্বতী- এই ত্রিদেবীকে তুষ্ট করার অভিপ্রায়ে এই পুজো করা হয়। এছাড়াও বলা হয় বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যে তিনটি শক্তি বিরাজ করছে ওই তিনটি শক্তিই বীজাকারে কুমারীতে নিহিত। তাই কুমারীকে দেবী রূপে পুজো করা হয়। প্রাচীন কালে মুনি ঋষিরা বিশ্বাস করতেন, মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরের অযুত প্রভাব রয়েছে। কারণ মানুষ চৈতন্যযুক্ত। আর যাঁদের মন সৎ ও কলুষতামুক্ত, খুব স্বাভাবিকভাবে তাঁদের মধ্যেই ঈশ্বরের প্রকাশ বেশি। শিশু কুমারীদের মধ্যে এই গুণগুলি থাকে বলেই তাদের বেছে নেওয়া হয় এই পুজোর দেবী হিসেবে। এই পুজো কল্যাণ,সুখ সমৃদ্ধি বয়ে আনে।
শাস্ত্র মতে এই কুমারীপুজোয় শিশু কন্যা অৰ্থাৎ কুমারীদের বয়সের নিরিখে নাম ভিন্ন হয়ে থাকে ও বয়সের বিচারে আলাদা আলাদা দেবী রূপে পূজিতা হন কুমারীরা। জানা যায়, ১ থেকে ১৬ বছর বয়স অবধি কুমারীদের বিভিন্ন নামের উল্লেখও শাস্ত্রে রয়েছে । যেমন : এক বছরের কুমারীর নাম সন্ধ্যা, দুই বছরের কুমারীর নাম সরস্বতী। তিন বছরের কুমারীর নাম ত্রিধামূর্তি, চার বছরের কুমারী হলেন কালিকা। পাঁচ বছরের সুভগা, ছয় বছরের উমা। সাত বছরের মালিনী, আট বছরের কুমারীর নাম কুষ্ঠিকা। নয় বছরের কালসন্দর্ভা, ১০ বছরের অপরাজিতা। ১১ বছরের কুমারীর নাম রুদ্রাণী, ১২ বছরের কুমারীর নাম ভৈরবী। ১৩ বছরের মহালক্ষ্মী, ১৪ বছরের পীঠনায়িকা। ১৫ বছরের ক্ষেত্রজ্ঞা ও ১৬ বছরের কুমারীকে অন্নদা বা অম্বিকা বলা হয়ে থাকে।
মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী দেবী মন্দিরে ও কন্যাকুমারীতে মহা ধুমধামের সঙ্গে কুমারী পুজো হয়। কথিত আছে, কুমারীপুজো ছাড়া হোম-যজ্ঞ করেও দুর্গাপুজোর সম্পূর্ণ ফল পাওয়া যায় না। কুমারীপুজোর আগে সাধক কুমারীকে নতুন বস্ত্র, ফুলের মালা ও মুকুটে সাজান। পায়ে আলতা, কপালে সিঁদুর ও তিলক সৌন্দর্যে রাঙিয়ে তোলেন। এরপর যথাসময়ে দেবী দুর্গার মূর্তির সামনে কুমারীকে বসিয়ে তার হাতে পদ্মফুল দিয়ে পুজো আরম্ভ করা হয়। প্রথাগত ভাবে ১৬ টি উপকরণ দিয়ে শুরু হয় কুমারী পুজোর আচার। পরে অগ্নি, জল, বস্ত্র, পুষ্প ও বাতাস—এই পাঁচ উপকরণ দিয়ে কুমারীকে পুজো করা হয়।