নিজস্ব প্রতিনিধি: প্রায় ৩৬০ বছর ধরে নিষ্ঠা সহকারে দুর্গাপুজো হচ্ছে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার জেলার দিনহাটা শহরের গোধূলিবাজার এলাকার মুস্তাফি পরিবারের বাসগৃহে। এই পরিবারের আদি নিবাস ছিল ওপার বাংলার ঢাকায়। ১৬৬৫ সালে তদানীন্তন কোচবিহারের রাজা মদন নারায়ণের আমন্ত্রণে ঢাকার নবাব দরবার থেকে কোচবিহার রাজ্যে এসেছিলেন এই পুজোর সূচনাকারী রুপচন্দ্রনারায়ণ মজুমদার। সেই সময় নবাব প্রদত্ত মজুমদার উপাধি ত্যাগ করে তিনি কোচবিহার অধিপতির দেওয়া মুস্তাফি উপাধি গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ভিতরকুঠি গ্রামে জমিদারি পান। তখন থেকেই তিনি ওই পুজো অশুরু করেন। সেই হিসাবে এই পুজো এবার প্রায় ৩৬০ বছর ছুঁয়ে ফেলছে। শুধু দিনহাটা(Dinhata) বা কোচবিহার জেলারই(Coachbehar District) নয়, গোটা উত্তরবঙ্গের(North Bengal) প্রাচীন পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম এই মুস্তাফি পরিবারের(Mustafi Family Durga Puja) পুজো। সময়ের হিসেবে নয়, রীতি রেওয়াজের দিক থেকেও এই পুজো এলাকার মানুষের মনে এক আলাদা জায়গা করে নিয়েছে।
মুস্তাফি পরিবারের সদস্যদের থেকেই জানা গিয়েছে যে, তাঁদের বাড়ির পুজো মৎস্যপুরাণ অনুসারে পরিচালিত হয় এবং পূজার আচারগুলি তালপাতার পুঁথিতে লিখে গিয়েছেন পূর্বপুরুষেরা। এই পুজোর ৩ বার স্থান বদল ঘটলেও তার রীতিতে কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি। এখানে দেবীর গাত্র ও মুখের বর্ণ টকটকে লাল। আবার অসুরের গাত্রবর্ণ সবুজ। পুজোতে ষষ্ঠীর দিন সন্ধ্যায় বেলগাছের নীচে বোধনের পুজো হয়। সেই সময়েই মা মনসাকে উৎসর্গ করে দেওয়া হয় দুধ ও কলা। তারপর হয় দেবীর অধিবাস। এখানে সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমী তিনদিনই চলে বলি। প্রতিটি বলির পরে দেবীকে মিশ্রির শরবত দেওয়া হয়। দশমীর দিন দুধ আর পান্তাভাত দিয়ে বিশেষ ভোগ নিবেদন করা হয় দেবীকে। এই পরিবার ব্রাহ্মণ হওয়ায় তাঁরা দেবীকে অন্নভোগ প্রদান করেন। ভোগের ক্ষেত্রে মাকে ঘি সহ ভাত, খিচুড়ি, সবজির তরকারি, বোয়াল বা শোল মাছের মাছের তরকারি, রান্না করা বলির মাংস, পায়েস, চালতার চাটনি দেওয়া হয়। সপ্তমীর পায়েসে চিনির পাশাপাশি বাতাসাও ব্যবহার করা হয়। আবার অষ্টমীতে পায়েসে চিনি আর বাতাসার জায়গায় ব্যবহার হয় মিছরি। নবমীর পায়েসে আবার চিনি আর বাতাসার সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া হয় মধুও।
সন্ধিপূজায়, দেবীকে ভাত ছাড়াই একটি মেনু দেওয়া হয় যাতে লুচি, সুজির পায়েস এবং অন্যান্য মিষ্টি থাকে। দশমীতে দেবীকে পান্তা ভাত ও দুধ নিবেদন করা হয়। সেও সঙ্গে চুনো মাছের একটি থালা দেবীকে উৎসর্গ করা হয় এবং একপাশে রাখা হয়। মজার ব্যাপার হল, এটি কিন্তু দেবীকে ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয় না। মুস্তাফি পরিবারের মহাষ্টমী পূজার গভীর রাতে, একটি গুপ্ত পূজা বা গোপন পূজা অনুষ্ঠিত হতো যখন পরিবারের কোনও সদস্য উপস্থিত থাকতেন না। এখন সেই পুজো উঠে গিয়েছে। তবে বাড়ির কোনও মহিলারাও পুজোর মূল গর্ভগৃহে পুজোর কোন কাজে অংশ নিতে পারেন না। তবে তাঁরা অষ্টমির পুজোর সময় সেখানে থাকতে পারেন এবং সন্ধিপুজোয় ১০৮ প্রদীপ জ্বালাতে পারেন। দশমীতে দেবীর বিসর্জনের আগে হয় দেবীর অস্ত্রের পুজো। আর যেহেতু এই পুজোয় মহিলাদের অংশগ্রহণ থাকে না, তাই পুজোর সব কাজই করেন পুরুষেরা।