নিজস্ব প্রতিনিধি: পূর্ব বর্ধমান(Purba Burdwan) জেলার দক্ষিণ সদর মহকুমার মধ্যে থাকা একটি ব্লক হল জামালপুর(Jamalpur)। দামোদরের দক্ষিণ পাড়ের সেই ব্লকেই রয়েছে চকদিঘী গ্রাম(Chakdighi Village)। সেই গ্রামেই রয়েছে একই বংশের ৩টি পৃথক পৃথক দুর্গাপুজো। আর সেই ৩ বাড়ির পুজোকে কেন্দ্র করেই পুজোর সময়ে জেগে ওঠে গোটা গ্রাম। ইতিহাস বলছে, এই ৩ বাড়ির পুজো আগে একসময় এক জায়গাতেই হতো। পরে বংশের শরিক বেড়ে গিয়ে ১ পুজো ভাগ হয়েছে ৩ পুজোয়। তবে এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই যে, এই বংশে দুর্গাপুজোর সূচনা ঘটান হরি সিংহ রায়। রাজা মান সিংহের অধীনে ১০ হাজারি মনসবদার হিসেবে এখনকার মধ্য ভারতের বুন্দেলখণ্ডের মাটি থেকে বাংলায় পা রেখেছিলেন সিংহরায় পরিবারের প্রথম পুরুষ। বুন্দেলখণ্ডের মাটিতে প্রোথিত যাদের পরম্পরা, কয়েক পুরুষ ধরে বাংলাউয় থেকে এখানকার কৃষ্টিকে সমৃদ্ধ করেছেন তাঁরা।
সিংহরায় পরিবারের(Singha Roy Family) ৩টি বাড়িতে ৩টি পুজো(Durga Puja) হয়। বড়বাড়ি, বাগানবাটী আর মণিরামবাটী। এই ৩ বাড়ির দুর্গাপুজোর নিয়মকানুন মোটামুটি একই। ৩টি পুজোই প্রায় ৩০০ বছরের পুরাতন। এর মধ্যে আদিপুজো বড়বাড়ির। এই ৩ বাড়িরই দুর্গাপ্রতিমা নির্মীত হয় বংশপরম্পরায় একজন শিল্পীর হাত ধরেই। তিনিই ৩ বাড়ির প্রতিমা নির্মাণ করেন। ৩ বাড়ির প্রতিমাই একচালার ও মায়ের গায়ের বর্ণ শিউলি ফুলের বোঁটার রঙে। নানা আচার-উপাচারে এখনও পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য মেনে চলেন পরিবারের সদস্যরা। তারমধ্যে একটি হল কুলদেবতার 300 বছরের পুরনো সিঁদুরের ব্যবহার। কথিত আছে, মোঘল আমলে বাংলায় চলে আসার সময় কুলদেবতার সিঁদুর সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন সিংহরায় পরিবারের সদস্যরা। প্রতি বছর নবমীতে সেই সিঁদুরের পুজো হয় চকদিঘি জমিদারবাড়িতে কুলদেবতা হিসেবে। পুজোর পরে প্রসাদ পাঠানো হয় বাগানবাড়িতে। এখানে রথের দিন থেকেই শুরু হয় পুজোর তোড়জোড়। মহালয়ার পরে প্রতিপদ থেকে শুরু হয় কল্পারম্ভ আর চণ্ডীপাঠ। সপ্তমী থেকে শুরু হয় মূল পুজো। সেই হিসাবে দেখতে গেলে এখানে পুজো হয় দশদিন ধরে। নিয়ম অনুযায়ী, এখানে দেবীমূর্তিতে প্রাণপ্রতিষ্ঠার পর আর ছবি তোলা যায় না দুর্গাপ্রতিমার । আজও তিনমহলা জমিদারবাড়ির অন্দরমহল থেকে পুজোমণ্ডপ পর্যন্ত পরদা টাঙানো হয়। সে পথে মণ্ডপে এসে অঞ্জলি দেন বাড়ির মহিলারা। অষ্টমীতে ধুনো পোড়ানোর রেওয়াজ রয়েছে ৩ বাড়িতেই।
সিংহরায় বাড়ির ৩টি পুজোয় বংশ পরম্পরায় করে আসছেন কণৌজের ব্রাহ্মণরা। তবে এখানে বলিপ্রথা নেই। বলি প্রথা নেই বলে দেবী যাতে অসন্তুষ্ঠ না হন তার জন্য তাঁকে সন্দেহ নিবেদন করা হয়। পুজোর ৩ দিন দুইবেলাই ভোগে দেওয়া হয়ে ঘিয়ে ভাজা লুচি আর সন্দেশ। দশমীতে এই বাড়িতে সিঁদুর খেলা হয় না। পরিবর্তে দশমীর পরেরদিন অর্থাৎ একাদশীতে হয় সত্যনারায়ণ পুজো আর দরিদ্র নারায়ণ সেবা। এদের যে ৩ বাড়িতে দুর্গাপুজো হয় সেখানে সারা বছর আর কোনও পুজোই প্রতিমাতে হয় না। হয় ঘটে। অর্থাৎ পুজোর পরের লক্ষ্মী পুজো, সরস্বতী পুজো, কালি পুজো যাই হোক না কেন, তা হয় ঘটে। তবে এদের আরেকটি বাড়ি রয়েছে। তা হল খাজাঞ্চিবাটী। সেখানে মা লক্ষ্মীর পুজো হয় প্রতিমাতে। তাই সেখানে আর কোনও পুজোয় প্রতিমা ব্যবহার করা হয় না। পরিবর্তে হয় ঘট পুজো। ভাসানের দিন সবার আগে বিসর্জিত হন বড়বাড়ির দুর্গা। তারপর বাগানবাটী আর মণিরামবাটীর প্রতিমা বিসর্জিত হয়।